প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটার বিরুদ্ধে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে একটি ফেডারেল বিচার শুরু হয়েছে, যেখানে কোম্পানির প্ল্যাটফর্মের নকশা ও তরুণ ব্যবহারকারীদের ওপর প্রভাব নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেন্টাকি ও নিউ জার্সি—এই চার রাজ্য দাবি করেছে, মেটা ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে শিশু ও কিশোরদের জন্য আসক্তিকর বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে এবং তরুণদের প্রতি ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে। ২০২৩ সালে ২৯ জন অ্যাটর্নি জেনারেলের একটি জোট এই মামলা দায়ের করে; প্রথমে চারটি রাজ্য এই বিচারে অংশ নিচ্ছে।

মামলার বিশেষত্ব হলো, রাজ্য পর্যায়ের অ্যাটর্নি জেনারেলরা এমন দাবি তুলতে পারেন যা ব্যক্তিগত বাদীদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষা আইনের (COPPA) অধীনে অভিযোগ এবং সম্ভাব্য লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্ষতির জন্য প্রতিকার চাওয়া। সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাই টেক ল ইনস্টিটিউটের সহ-পরিচালক এরিক গোল্ডম্যান ফরচুনকে জানান, “এই মামলায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সম্ভাব্য বহু লক্ষ মানুষের ক্ষতির ওপর নির্ভর করবে, তাই ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি।” মেটা জানিয়েছে, রাজ্যগুলোর তত্ত্ব অনুযায়ী সম্ভাব্য জরিমানা ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—যা কোম্পানির বাজারমূল্যের কাছাকাছি। গত বছর মেটার আয় ছিল প্রায় ২০১ বিলিয়ন ডলার এবং জুনের শেষে নগদ ও বাজারযোগ্য সিকিউরিটিজে ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। গোল্ডম্যানের মতে, সবচেয়ে চরম ক্ষেত্রে এই অর্থদণ্ড কার্যত শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা মূল্য জনগণের কাছে স্থানান্তর করতে পারে; অর্থাৎ, “মেটাকে চাবি ফিরিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলা হচ্ছে।”

তবে এই বিশাল অঙ্কে পৌঁছানো সহজ হবে না। আট সদস্যের জুরি শুধু পরামর্শমূলক; চূড়ান্ত রায় ও প্রতিকারের সিদ্ধান্ত নেবেন মার্কিন জেলা বিচারক ইয়ভন গনজালেজ রজার্স। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ও তথ্য আইনের অধ্যাপক জেমস গ্রিমেলম্যান বলেন, তিনি মনে করেন না এই বিচার মেটাকে দেউলিয়া করে দেবে। “জুরি কেবল পরামর্শ দেবে, যা আদালতের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। এমনকি অত্যন্ত উচ্চ অঙ্ক এলেও বিচারক তা সংশোধন করতে পারেন এবং আপিলেও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে,” তিনি জানান। নিউ মেক্সিকোতে সম্প্রতি একটি মামলায় মেটাকে রাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইনের ৭৫ হাজার লঙ্ঘনের জন্য ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা এবং তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতির জন্য আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার—মোট ৯৪২ মিলিয়ন ডলার—দিতে বলা হয়েছিল; মেটা এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে।

মেটার মুখপাত্র স্টেফানি ওটওয়ে ইমেইলে জানান, রাজ্যগুলোর দাবি “অপ্রমাণিত” এবং তাদের আর্থিক চাহিদা “অত্যন্ত অসমানুপাতিক”। কোম্পানির যুক্তি—এই রাজ্যগুলোতে কেউ যে বিভ্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা প্রমাণিত হয়নি। বরং মেটাকে “বয়স যাচাইয়ের মতো শিল্পজুড়ে চ্যালেঞ্জের” জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। ইনস্টাগ্রামে কিশোরদের থেকে আয়ের পরিমাণ মেটার মোট আয়ের ১ শতাংশেরও কম, তবে গোল্ডম্যান জোর দিয়ে বলেন, সরাসরি আয়ের অংশ নয়, বরং সমাজে মেটা কতটা ক্ষতি করছে—সেই প্রশ্নই কেন্দ্রীয়।

বিচারের মূলে রয়েছে প্ল্যাটফর্মের নকশা নিয়ে বিতর্ক। সাধারণত Section 230 ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোকে ব্যবহারকারীর পোস্ট করা বিষয়বস্তুর জন্য দায়মুক্তি দেয়। রাজ্যগুলোর দাবি, তারা ব্যবহারকারীর পোস্ট নিয়ে মামলা করছে না; বরং মেটা কীভাবে সেই বিষয়বস্তু ব্যবহারকারীদের সামনে উপস্থাপন করছে—সেই নিজস্ব সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করছে। গোল্ডম্যান এই পার্থক্যকে “ভ্রমাত্মক” বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, সম্পাদকীয় কাজ ও উপস্থাপনার মধ্যে আলাদা করা সম্ভব নয়। “আপনি সম্পাদকীয় কাজকে আলাদা করে বলতে পারেন না যে আমরা বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনের পদ্ধতি মুছে ফেলব—এগুলো একই বিষয়,” তিনি বলেন। তবে বিচারক রজার্স এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা মামলাটিকে বিচারের মুখোমুখি হতে দিয়েছে। গোল্ডম্যান প্রথম সংশোধনীর উদ্বেগও তুলে ধরেন—মেটার পোস্ট উপস্থাপনের সিদ্ধান্তগুলো একটি প্রকাশনার সম্পাদকীয় পছন্দের মতো, যেমন শিরোনামের আকার বা ছবির ব্যবহার, যা সংবিধানের সুরক্ষার আওতায় পড়ে।

ওকল্যান্ডের এই বিচারের ফলাফল শুধু মেটার জন্যই নয়, বরং টিকটক, ইউটিউব ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে চলমান একই ধরনের মামলার জন্যও নতুন পথ তৈরি করতে পারে। গোল্ডম্যান আরও বলেন, জেনারেটিভ এআই, ভিডিও গেম ও সামাজিক গেমিংয়ের বিরুদ্ধেও একই আইনি তত্ত্বে মামলা হচ্ছে। তাই সম্ভাব্য বিশাল জরিমানা ছাড়াও, এই বিচারে নির্ধারিত হতে পারে ভবিষ্যতের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণের কাঠামো। তাঁর ভাষায়, “ওকল্যান্ডে এখন শুধু মেটা নয়, ইন্টারনেটই বিচারের মুখোমুখি।”