১৬ বছর পর বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তুলেছে স্পেন। এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে, যার নাম তিন বছর আগেও স্পেনের বাইরে খুব একটা পরিচিত ছিল না। ৬৫ বছর বয়সী এই কোচের চোখে গোল ফ্রেমের চশমা আর সরল চেহারা দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে তিনি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে এসেছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি একজন কৌশলী মাঠকর্মী, যিনি দলের প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

দে লা ফুয়েন্তের ফুটবল দর্শন অত্যন্ত সহজ অথচ কার্যকর। বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলা এবং বল হারানোর পরপরই চাপ সৃষ্টি করা—এই কৌশল অনেকটা পেপ গার্দিওলার প্রথম দিকের বার্সেলোনার মতো। এমনকি কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেও তিনি নিজের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজলেও তিনি ধৈর্য হারাননি, শেষ পর্যন্ত দল ঠিকই জয় ছিনিয়ে এনেছে। ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দলকেও নিজেদের ফাঁদে ফেলে দেওয়ার মাস্টারপ্ল্যান ছিল তাঁরই।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর লুইস এনরিকে পদত্যাগ করলে দে লা ফুয়েন্তেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ে তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ক্লাব ফুটবলে তার একমাত্র বড় দায়িত্ব ছিল তৃতীয় বিভাগের দল আলাভেসের কোচ হওয়া, যেখান থেকে তিনি মাত্র ১১ ম্যাচ পরেই বরখাস্ত হয়েছিলেন। এরপর প্রায় দুই বছর কোচিং থেকে দূরে ছিলেন। তাই অনেকেই তার নিয়োগে সন্দিহান ছিলেন।

কিন্তু স্পেনের বয়সভিত্তিক ফুটবলে দে লা ফুয়েন্তের অবদানই তাকে এই দায়িত্ব দেওয়ার মূল কারণ ছিল। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে পর্তুগাল ও স্পেনের ক্লাবে কাজ করার পর ২০১৩ সালে তিনি স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব পান। পরের নয় বছরে অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলকে ইউরো জিতিয়েছেন এবং ২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিকে রুপা এনে দিয়েছেন। এই সময়ে তার হাত ধরে বেড়ে উঠেছেন রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, মিকেল মেরিনো ও উনাই সিমনের মতো তারকারা।

সাবেক স্পেন মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা মনে করিয়ে দিয়েছেন, দে লা ফুয়েন্তের সাফল্যের গোপন রহস্য হলো এই দলের অনেকের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক। তিনি শুধু কোচ নন, তাদের একজন অভিভাবকও বটে। উদাহরণস্বরূপ, উনাই সিমনের কথা ধরা যাক। দাভিদ রায়া ও হোয়ান গার্সিয়ার মতো শীর্ষ গোলকিপার থাকার পরও কেন সিমনই স্পেনের পোস্ট সামলাচ্ছেন? কারণ দে লা ফুয়েন্তে তাকে চেনেন দীর্ঘদিন ধরে। সিমন এই বিশ্বকাপে গোল্ডেন গ্লাভ জিতেছেন, পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছেন।

ব্যালন ডি’অরজয়ী রদ্রি বড় চোট থেকে ফেরার পরও কোচ তার ওপর আস্থা রেখে তাকে অধিনায়ক বানিয়েছেন। সেই আস্থার প্রতিদান রদ্রি দারুণভাবেই দিয়েছেন। মার্ক কুকুরেয়া, পেদ্রো পোরোদের ক্লাব মৌসুম ভালো না গেলেও বিশ্বকাপে তারা নিজেদের সেরা সংস্করণ হয়ে উঠেছেন। আবার পেদ্রির মতো মিডফিল্ডারকে বসিয়ে রাখতেও দ্বিধা করেননি দে লা ফুয়েন্তে।

দে লা ফুয়েন্তে সব সময়ই জোর দিয়েছেন দলের ভেতরের বন্ধনের ওপর। বিশ্বকাপ শুরুর আগে মার্ক কুকুরেয়া স্প্যানিশ রেডিওতে মজা করে বলেছিলেন, দল জিতলে কোচের ট্যাটু করাবেন। ৬৫ বছর বয়সী এই ‘বুড়ো’ কোচ ম্যাচ শেষে এ নিয়ে মজাও করেছেন। তার চরিত্র এমনই—সন্তানসম ফুটবলারদের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারেন। এই কারণেই ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে আবার ফুটেছে স্প্যানিশ লাল পদ্ম।