কানাডায় উন্নত জীবনের আশায় অনেক মানুষ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। সম্প্রতি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থানা এলাকা থেকে এমনই একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মারিফুল ইসলাম ও বাচ্চা বাউ ওরফে হাসিনুর। এই চক্রটি কানাডার ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা অ্যাপ্রুভাল লেটার এবং অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছিল। পুলিশ তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও জাল পাসপোর্ট উদ্ধার করেছে।
এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে এবং কানাডায় প্রকৃত ওয়ার্ক ভিসা পাওয়ার সঠিক প্রক্রিয়া জানা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডায় বর্তমানে বেকারত্বের হার প্রায় ৬ শতাংশ। এর উপরে দেশটিতে লাখ লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা প্রতিনিয়ত কাজের সন্ধান করছেন। এই শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই দেশটির কাজের ধরন ও পরিবেশ সম্পর্কে পরিচিত। তাদের সঙ্গে একজন বিদেশি নাগরিকের প্রতিযোগিতা করা কঠিন।
এছাড়া, কানাডায় একটি বিদেশি নাগরিককে চাকরি দেওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত আবেদন জমা পড়ে। সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো কাজের দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। ভাষাগত দক্ষতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কানাডার সরকারি ভাষা ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ। তাই ইংরেজির জন্য আইইএলটিএস এবং ফ্রেঞ্চের জন্য টিইএফ বা টিসিএফ পরীক্ষায় ভালো স্কোর থাকা জরুরি। ভাষাগত দক্ষতা না থাকলে কানাডায় চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়।
কানাডার ওয়ার্ক পারমিট কীভাবে পাওয়া যায়, তা বোঝাও জরুরি। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আগে একটি বৈধ চাকরির প্রস্তাব থাকতে হয়। নিয়োগকর্তাকে সরকারের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে ওই পদে কানাডার কোনো নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা পাওয়া যায়নি। এই প্রক্রিয়াটি লেবার মার্কেট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (এলএমআইএ) নামে পরিচিত। তবে সব চাকরির জন্য এলএমআইএ বাধ্যতামূলক নয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি, বিশেষ কর্মসূচি বা নির্দিষ্ট পেশার ক্ষেত্রে এলএমআইএ ছাড়াও ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়।
একটি বৈধ ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার প্রক্রিয়া সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে কানাডার কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রকৃত চাকরির প্রস্তাব পেতে হয়। দ্বিতীয় ধাপে নিয়োগকর্তাকে এলএমআইএর জন্য আবেদন করে অনুমোদন নিতে হয়। তৃতীয় ধাপে আবেদনকারী ওয়ার্ক পারমিটের জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেন। এর মধ্যে চাকরির প্রস্তাব, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার প্রমাণ, ভাষাগত দক্ষতার সনদ এবং প্রয়োজনে স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট থাকে। চতুর্থ ধাপে বায়োমেট্রিক্স ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ভিসার সিদ্ধান্ত দেয়। শেষ ধাপে ভিসা পেলে কানাডায় পৌঁছানোর পর সীমান্ত কর্মকর্তার চূড়ান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা হয়।
প্রতারকরা সাধারণত বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে। তারা নামী প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির প্রস্তাবপত্র তৈরি করে, জাল এলএমআইএ বা ওয়ার্ক পারমিটের কপি দেখায় এবং ভিসা অনুমোদনের নকল চিঠি পাঠায়। সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করাও তাদের একটি সাধারণ কৌশল। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডায় থাকা ব্যক্তিদের ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করে। তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং অগ্রিম টাকা দাবি করে। কানাডার কান্ট্রি কোড (+1) ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমোতে ফোন করে তারাও প্রতারণা করে থাকে।
কানাডায় চাকরির প্রস্তাব পেলে কিছু বিষয় যাচাই করা উচিত। প্রথমত, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে আছে কি না, তাদের ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ওয়েবসাইট মিলিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, চাকরির প্রস্তাবপত্রে বেতন, কর্মস্থল, দায়িত্ব এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবসম্মত কি না তা খেয়াল করতে হবে। তৃতীয়ত, ই-মেইলটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডোমেইন থেকে এসেছে নাকি সাধারণ ফ্রি ই-মেইল ব্যবহার করা হয়েছে, তা দেখতে হবে। চতুর্থত, কোনো ওয়েবসাইটে ভিসা যাচাই করতে বলা হলে সেটি সত্যিই সরকারি ওয়েবসাইট কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।
অর্থ লেনদেনের আগে বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে বড় অঙ্কের টাকা না পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সব অর্থ লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করা উচিত। কোনো নথিতে স্বাক্ষরের আগে তা ভালোভাবে পড়ে বোঝা জরুরি। সন্দেহ হলে কানাডার অনুমোদিত ইমিগ্রেশন পরামর্শক বা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কানাডায় ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া মানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার পাওয়া নয়। ওয়ার্ক পারমিট একটি অস্থায়ী অনুমতি। পরে যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, ভাষাদক্ষতা এবং প্রচলিত অভিবাসন কর্মসূচির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কেউ স্থায়ী বাসিন্দার জন্য আবেদন করতে পারেন। তাই ‘ওয়ার্ক পারমিট মানেই নিশ্চিত পিআর’—এ ধরনের প্রচারণা বিভ্রান্তিকর। কানাডায় উন্নত জীবনের স্বপ্ন যেন প্রতারণার ফাঁদে না পড়ে, সে জন্য যাচাই-বাছাইয়ের কোনো বিকল্প নেই। শর্টকাট বলে কিছু নেই; সঠিক তথ্য, বৈধ প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যই নিরাপদ অভিবাসনের ভিত্তি।



