বর্তমান যুগের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং শান্ত লাইব্রেরির ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল আড়াই হাজার বছর আগের এক জ্ঞানভাণ্ডার। বর্তমান ইরাকের মসুল শহরের নিকটবর্তী প্রাচীন নিনেভেহ নগরীতে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে গড়ে উঠেছিল আসিরিয়ার রাজা আশুরবানিপালের রাজকীয় লাইব্রেরি। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যানুসারে, এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম সুসংগঠিত ও সুবিন্যস্ত গ্রন্থাগার, যা কেবল রাজকীয় দলিল বা হিসাব-নিকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়নি, বরং তৎকালীন বিশ্বের বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের এক বিশাল সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিতি পায়।
খ্রিস্টপূর্ব ৬৬৮ থেকে ৬৩১ অব্দ পর্যন্ত শাসন করা সম্রাট আশুরবানিপাল ছিলেন আসিরিয়া সাম্রাজ্যের শেষ শাসক। প্রাচীন আসিরীয় রাজারা সাধারণত সামরিক বিজয় ও কঠোরতার জন্য পরিচিত হলেও আশুরবানিপাল ছিলেন ব্যতিক্রমী। রাজপরিবারের তৃতীয় সন্তান হওয়ায় তাকে ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, যার ফলে তিনি অত্যন্ত পণ্ডিত ও উচ্চশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। তিনি নিজে জটিল পাণ্ডুলিপি পাঠ করতে পারতেন এবং লেখালেখির প্রতি তার প্রবল অনুরাগ ছিল। তাঁর শাসনামলে তরবারির শক্তির পাশাপাশি জ্ঞানচর্চাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নিনেভেহ শহরে এর আগেও কিছু প্রশাসনিক আর্কাইভ ছিল, কিন্তু আশুরবানিপাল সেগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরিতে রূপান্তর করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানবজাতির অর্জিত যাবতীয় জ্ঞান এক স্থানে জড়ো করা। ফলে তাঁর সংগ্রহশালায় জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, ধর্ম, ইতিহাস, কবিতা, জাদুবিদ্যা এবং লোককাহিনির মতো বিভিন্ন বিষয়ের সংকলন তৈরি হয়। এই বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলতে তিনি একদল দক্ষ লিপিকার নিয়োগ করেছিলেন যারা প্রতিলিপি তৈরির কাজ করতেন। এছাড়া নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন করদ রাজ্য ও মন্দির থেকে গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে বিজিত এলাকা থেকে গ্রন্থ লুট করে আনতেন তিনি। এমনকি নির্দিষ্ট বিষয়ের বইয়ের অনুলিপি দ্রুত পাঠানোর জন্য তিনি পণ্ডিতদের কাছে এক ধরণের তালিকা বা ফরমায়েশ পাঠিয়ে বাধ্য করতেন।
এই প্রাচীন লাইব্রেরির ব্যবস্থাপনা ছিল অত্যন্ত আধুনিক। ৩০ হাজারেরও বেশি মাটির ফলকের প্রতিটিতে নির্দিষ্ট 'মেটাডেটা' বা কোলফোন খোদাই করা থাকত, যা বর্তমানের বারকোড বা স্ট্যাম্পের মতো কাজ করত। এর মাধ্যমে ফলকের সিরিজ নম্বর এবং মালিকানার কথা জানা যেত। ফলক চুরি বা ক্ষতি করলে দেবতার অভিশাপ নেমে আসবে—এমন কঠোর সতর্কবার্তাও খোদাই করা থাকত এতে। এই সংগ্রহশালার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল প্রাচীনতম মহাকাব্য ‘গিলগেমেশ’-এর ঐতিহাসিক সংস্করণগুলো। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ফলকগুলো না থাকলে মহাকাব্যের অনেক অংশ এবং মেসোপটেমীয় সাহিত্যের প্রভাব গ্রিক সাহিত্যের ওপর কীভাবে পড়েছিল, তা জানা সম্ভব হতো না।
তবে খ্রিস্টপূর্ব ৬১২ অব্দে মেদ ও ব্যাবিলনীয়দের যৌথ আক্রমণে নিনেভেহ নগরী ধ্বংস হয়ে যায় এবং রাজপ্রাসাদ আগুনে পুড়ে ছাই হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডই কাঁচা মাটির ফলকগুলোকে পুড়িয়ে শক্ত ইটে পরিণত করে, যা পরবর্তী দুই হাজার বছর মাটির নিচে সুরক্ষিত রাখে। যদিও চামড়া বা প্যাপিরাসের নথিগুলো পুড়ে গিয়েছিল, কিন্তু মাটির ফলকগুলো টিকে থাকে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অস্টেন হেনরি লেয়ার্ড এবং হোরমুজদ রাসসাম এই ধ্বংসাবশেষ থেকে ফলকগুলো উদ্ধার করেন, যা পরে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থানান্তরিত হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সেই ভাঙা টুকরোগুলো জুড়ে দিয়ে প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার করা হয়। সম্রাট আশুরবানিপালের সেই জ্ঞানপিপাসাই আজ আমাদের প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।




