আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর ইস্টার্ন টাইম সকাল ৭টার হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম দাঁড়িয়েছে ব্যারেল প্রতি ১০৮.৩৩ ডলারে। এটি পূর্ববর্তী দিনের তুলনায় ৩.৫৯ ডলার বেশি। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঠিক এক বছর আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৬৬.৪৭ ডলার, অর্থাৎ গত এক বছরে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬২.৯৭ শতাংশ। এক মাস আগের তুলনায় বর্তমান দাম ৯.২৫ শতাংশ বেশি, যা তখন ছিল ৯৯.১৫ ডলার।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামের ওঠা-নামা মূলত সরবরাহ এবং চাহিদার ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা কিংবা বড় ধরনের কোনো বৈশ্বিক অস্থিরতা এই দামকে হঠাৎ করে প্রভাবিত করতে পারে। তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে গ্যাস পাম্পে জ্বালানির দাম নির্ধারিত হয় অপরিশোধিত তেল, রিফাইনারি খরচ, পাইকারি মূল্য, সরকারি কর এবং স্টেশনের মুনাফার সমন্বয়ে। যেহেতু প্রতি গ্যালন জ্বালানির মূল্যের অর্ধেকের বেশি অংশই অপরিশোধিত তেলের দাম দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাই তেলের দাম বাড়লে দ্রুত তা পাম্পের মূল্যে প্রতিফলিত হয়। তবে তেলের দাম কমলে তা সাধারণ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে কিছুটা সময় নেয়, যাকে জ্বালানি বাজারে 'রকেট এবং ফেদার' ইফেক্ট বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (Strategic Petroleum Reserve) জরুরি মুহূর্তে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। নিষেধাজ্ঞা, ভয়াবহ ঝড় বা যুদ্ধের মতো দুর্যোগের সময়ে এই রিজার্ভ থেকে তেল সরবরাহ করে বাজার স্থিতিশীল রাখা হয় এবং মূল্যের তীব্র উল্লম্ফন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়, বরং জরুরি পরিষেবা এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত সচল রাখতে একটি সাময়িক সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে।

তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। ঐতিহাসিকভাবে তেলের বাজার প্রধানত দুটি মানদণ্ডে চলে—বৈশ্বিক স্তরে 'ব্রেন্ট ক্রুড' এবং উত্তর আমেরিকায় 'পশ্চিম টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট' (WTI)। বিশ্ববাজারের সামগ্রিক চিত্র বুঝতে ব্রেন্ট ক্রুডকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, এমনকি ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও তাদের বার্ষিক 전망ে একেই প্রধান রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে।

পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তেলের বাজার কখনোই স্থিতিশীল ছিল না। ১৯৭০-এর দশকের ইয়োম কিপুর যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি কমানোর ফলে প্রথম বড় ধরনের তেল সংকট দেখা দেয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চাহিদা হ্রাস এবং ওপেকের বাইরে নতুন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আগমনে দাম কমেছিল। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের আগে দাম বাড়লেও পরে তা দ্রুত হ্রাস পায়। সবচেয়ে নাটকীয় পতন ঘটেছিল ২০২০ সালের কোভিড লকডাউনের সময়, যখন তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।

বর্তমান সময়ে তেলের দাম নির্ধারণে ভূ-রাজনীতি এবং ওপেক প্লাস (OPEC+) এর সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ড্রিলিং বা খনি খনন নীতির প্রভাবও থাকে। যেমন, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজের উপকূলীয় সমতলের ১৫ লাখ একরের বেশি জায়গায় তেল ও গ্যাস লিজিং পুনরায় চালু করার পদক্ষেপ নেয়, যা বাইডেন প্রশাসনের সীমাবদ্ধ নীতির বিপরীত ছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শ্যাল অয়েল (Shale oil) উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ে, যা দামের তীব্র বৃদ্ধি রোধ করতে সাহায্য করে।

পরিশেষে, তেলের দাম বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু ঘরোয়া heating বা বিদ্যুৎ বিল বাড়ে না, বরং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুদি দোকান থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বেড়ে যায়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।