সাধারণ মানুষের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ক্রয়-বিক্রয়ের একটি অবৈধ বাজার অনলাইনে দেদারছে চলছে। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা নানা ওয়েবসাইট—সবখানেই অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), কল ডিটেল রেকর্ড (সিডিআর), মুঠোফোনের অবস্থান, এসএমএসের তালিকা, টিআইএন, পাসপোর্টের তথ্য এমনকি মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেন বিবরণীও। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
গত জুনে ভোটার তালিকা বিক্রির খবর খোঁজার সময় একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্য থেকে এ বিষয়টি নজরে আসে ডিসমিসল্যাবের। এরপর 'সাইন কপি' শব্দটি ব্যবহার করে সার্চ চালিয়ে তারা ৬৭৫টি পোস্ট পেয়েছে, যার মধ্যে ৬০৫টিতে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রস্তাব ছিল। এই পোস্টগুলোর সূত্র ধরে 'ভোটার লিস্ট' নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান মেলে। সেখানে এনআইডি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে গবেষকরা ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করেন। মাত্র ৫০০ টাকা দিলে ১৭ মিনিটের মধ্যে একটি মুঠোফোন নম্বরের গ্রাহকের এনআইডি কার্ডের পিডিএফ পাঠানো হয়। সেই কার্ডের নাম, ছবি, জন্মতারিখসহ সব তথ্য প্রকৃত সিম-মালিকের সঙ্গে মিলে যায়। এমনকি দুই মাস আগে সংশোধন করা তাঁর মায়ের নামও হালনাগাদ অবস্থায় পাওয়া যায়।
একই গ্রুপে 'হেল্প বিডি' নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকেও নানা ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল। সেখানে এনআইডির পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, মোবাইল অবস্থান, সিডিআর, এসএমএস তালিকা, আইএমইআই নম্বর, টিআইএন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্ট কপি এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ বিক্রির কথা বলা হয়। ২৫ জুন ওই অ্যাকাউন্টের অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। একটি গ্রামীণফোন নম্বরের তিন মাসের কল ডিটেল রেকর্ড চাইলে ১ হাজার ৫০ টাকা দিতে বলা হয়। টাকা পাঠানোর আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই তারা একটি ফাইল পাঠায়। ফাইলের সাম্প্রতিক ২০টি যোগাযোগ নম্বর, কলের সময় ও ধরন প্রকৃত কল-ইতিহাসের সঙ্গে মিলে যায়। আরেকটি ওয়েবসাইটে একটি নম্বরের অবস্থান জানতে চাইলে টাকা দেওয়ার ১৬ মিনিটের মধ্যে সর্বশেষ সক্রিয় সময়, মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান, একটি ঠিকানা ও গুগল ম্যাপের লিংক পাঠানো হয়।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, টিআইএন, সিডিআর, মোবাইল অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্যের মূল্যতালিকা রয়েছে। প্রায় সব কটির নকশা ও পরিচালনপদ্ধতি একই ধরনের। এই পোস্টগুলোতে যোগাযোগের জন্য অন্তত ১১২টি ভিন্ন মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ৩৬টি সক্রিয় ফেসবুক গ্রুপে বারবার তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক বিক্রেতাই সরাসরি তথ্যের উৎস নন। তাঁরা অন্য ওয়েবসাইট বা গ্রুপ থেকে তথ্য কিনে বেশি দামে বিক্রি করেন। চাঁদপুরের একটি ওয়েবসাইটের মালিক ডিসমিসল্যাবকে জানিয়েছেন, তিনি ৮০০ টাকায় মোবাইল গ্রাহকের কল তালিকা কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন। ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিকাশ স্টেটমেন্টও পাওয়া যায়। ওই বিক্রেতা দাবি করেছেন, একটি গ্রুপ এপিআই ব্যবহার করে সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে তথ্য সংগ্রহ করে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।
ডিসমিসল্যাব বলছে, ২০২৩ সাল থেকেই ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির পোস্ট পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে ইউটিউবে একই ধরনের সেবার ভিডিওও পাওয়া গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেছেন, কল ডিটেল রেকর্ড ও অবস্থান তথ্যের মাধ্যমে একজন মানুষের যোগাযোগ ও চলাফেরার ধরন জানা সম্ভব। ফলে এসব তথ্য নজরদারি, হয়রানি বা প্রতারণার কাজে ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘ সময়ের রেকর্ড থেকে একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন গতিবিধিও অনুমান করা সম্ভব, যা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।



