প্রথিতয্য অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের 'জগৎ কুটির' গ্রন্থটি নিছক কোনো জীবনকাহিনী নয়, বরং এটি একজন মানুষের আত্মানুসন্ধানের দলিল। বইটিতে তিনি তাঁর ফেলে আসা জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন কোথায় তাঁর বৌদ্ধিক চিন্তার বীজ রোপিত হয়েছিল। তাঁর শৈশব, কৈশোরের অভিজ্ঞতা এবং জীবনযুদ্ধের নানা মোড় কীভাবে তাঁর অর্থনীতি, দর্শন ও ন্যায়বিচার সংক্রান্ত ধারণাকে প্রভাবিত করেছে, তা এখানে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যেমন নাদিন গর্ডিমার, নিকোলাস স্টার্ন এবং কোফি আনান তাঁকে একজন বহুমাত্রিক চিন্তাবিদ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, যিনি দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কথা অত্যন্ত অন্তর্দৃষ্টির সাথে তুলে ধরতে পারেন।

অমর্ত্য সেনের চিন্তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ঢাকা, যেখানে তাঁদের পারিবারিক নিবাসের নাম ছিল ‘জগৎ কুটির’। রসায়নের অধ্যাপক আশুতোষ সেনের পুত্র অমর্ত্যর শৈশব কেটেছে ঢাকা, মান্দালয় এবং শান্তিনিকেতনের মতো ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে। এই বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক অবস্থান তাঁকে খুব অল্প বয়সেই শিখিয়েছিল যে পৃথিবীকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ঢাকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার বিপরীতমুখী অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয় সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, মানুষকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা জাতীয় পরিচয়ে সংকুচিত করা হলে তা অনেক সময় সহিংসতার জন্ম দেয়।

তাঁর মনন গঠনে মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেনের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সংস্কৃত ও ভারতীয় দর্শনের পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন নাতির যৌক্তিক প্রশ্নকে কখনো খাটো করেননি, যা অমর্ত্যর মনে প্রশ্ন করার সাহস ও স্বাধীন চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করে। এছাড়া কবীরের মানবিক দর্শন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্ববোধ তাঁর চিন্তার দিগন্তকে আরও বিস্তৃত করেছে। শান্তিনিকেতনের মুক্ত পরিবেশ এবং আর্যভটের মতো গণিতজ্ঞদের প্রতি আকর্ষণ তাঁর মধ্যে যুক্তি ও অনুসন্ধিৎসার জন্ম দেয়। এর ফলে তাঁর কাছে জ্ঞান কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না; সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত ও অর্থনীতি তাঁর বৌদ্ধিক জগতে একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

জীবনের দুটি বিশেষ ঘটনা তাঁর অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি গড়ে দেয়। প্রথমটি হলো ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ। খাদ্য মজুত থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষ না খেয়ে মরছে—এই প্রশ্ন থেকে তাঁর বিখ্যাত 'এন্টাইটেলমেন্ট অ্যাপ্রোচ' বা অধিকারভিত্তিক বিশ্লেষণ তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার কাদের মিয়ার মৃত্যু তাঁকে স্বাধীনতার এক জটিল সংজ্ঞার মুখোমুখি করে। তিনি দেখেন, আইনি স্বাধীনতা থাকলেও চরম দারিদ্র্য মানুষের সামনে বিকল্প সুযোগ কমিয়ে দেয়, যা প্রকৃত স্বাধীনতার অন্তরায়। এই অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীতে তাঁর 'সক্ষমতা-ভাবনা' বা Capability Approach-এর জন্ম দেয়, যেখানে উন্নয়ন মানে কেবল সম্পদ বৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের বাস্তব সম্ভাবনার পরিসর বাড়ানো।

শিক্ষাজীবনের During প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে তাঁর চিন্তার ধার আরও শাণিত হয়। সেখানে তিনি জন রলস এবং কেনেথ অ্যারোর মতো চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রভাবিত হলেও নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। কেমব্রিজের অ্যাকাডেমিক পরিবেশের সাথে ঢাকা ও শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞতা এবং ভারতীয় যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের সংলাপে তাঁর বিশ্বজনীন চিন্তা বিকশিত হয়। এমনকি মার্কসবাদের প্রতি তাঁর আকর্ষণ থাকলেও তিনি কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের অন্ধ অনুসারী হননি, বরং বাস্তবতার আলোকে তার সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা বিচার করেছেন।

পরিশেষে, 'জগৎ কুটির' দেখায় যে একজন চিন্তকের গঠন কেবল পাঠ্যবই বা তত্ত্বের মাধ্যমে হয় না; বরং দেখা, শোনা, সংশয় এবং ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে তা গড়ে ওঠে। কিশোর বয়সে মুখের ক্যান্সারের সাথে লড়াই এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া তাঁকে জীবনের অনিশ্চয়তা বুঝতে সাহায্য করেছিল। বইটির নাম 'জগৎ কুটির' যেমন একটি সীমিত পরিসর এবং অসীম বিস্তারের সহাবস্থান বোঝায়, অমর্ত্য সেনের চিন্তাও ঠিক তেমনি—নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়কে আঁকড়ে ধরে বিশ্বজনীন সত্যের অনুসন্ধান।