বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস, রাজনীতি এবং দলটির অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রকাশিত হলো ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা গ্রন্থ 'Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics'। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (UPL) থেকে প্রকাশিত ২৪২ পৃষ্ঠার এই বইটির বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছেন প্রখ্যাত বাংলাদেশি-মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
অধ্যাপক রীয়াজের মতে, এই বইটি দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে লেখক জামায়াতের ইতিহাস এবং দলটির সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন বিতর্ক ও অবশেষে পদত্যাগের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। রীয়াজ উল্লেখ করেন যে, জামায়াত নিয়ে আগে অনেক বই লেখা হলেও সেগুলো ছিল মূলত বাইরের গবেষকদের দৃষ্টিতে। কিন্তু রাজ্জাকের এই প্রচেষ্টা ভিন্ন, কারণ তিনি দলের ভেতর থেকে এর সাফল্য এবং ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। লেখকের প্রধান দাবি হলো, জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অতীত ভুলগুলোর মোকাবিলা করার সাহসের ওপর।
বইটিতে লেখক দুটি গুরুতর সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন: নেতৃত্বের ঘাটতি (Leadership Deficit) এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষয় (Intellectual Decline)। রাজ্জাকের মতে, জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো কেবল অনুগত কর্মী তৈরি করতে পারে, কিন্তু রাশেদ ঘানুচি বা রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মতো দূরদর্শী নেতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া রাজনীতিতে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে দলের ভেতর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা কমে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
গ্রন্থটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ভূমিকা এবং সেই অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার প্রশ্ন। ব্যারিস্টার রাজ্জাক জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সাল থেকেই দলের ভেতরে এই বিষয়ে আলোচনা ছিল। এমনকি ১৯৭৬ সালে আইডিএল (IDL) প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল জামায়াতের সংস্কার। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১০ সালে কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে সংস্কারের চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে দল থেকে নেতাদের বহিষ্কার বা পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। লেখক এই অমীমাংসিত প্রশ্নটিকে জামায়াতের 'একিলিস হিল' বা দুর্বলতম জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বইয়ের দ্বিতীয় অংশে লেখক কিছু মৌলিক আদর্শিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি আলোচনা করেছেন যে, শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতায় যাওয়া বা ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করা কি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা? বিভিন্ন ইসলামি চিন্তাবিদদের মতামতের আলোকে রাজ্জাক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয় এবং বর্তমান যুগে একে তিনি 'অলীক' বলে মনে করেন। তিনি রাশেদ ঘানুচির 'মিনিমাল স্টেট' ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন।
রাজ্জাক প্রচলিত অর্থ an ইসলামি দলের পরিবর্তে সমাজের ভেতর থেকে ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও ন্যায়বিচার ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি তিউনিসিয়ার আন-নাহদা, তুরস্কের একেপি এবং মরক্কোর পিজেডি-র সাংগঠনিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের মডেলগুলোকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ তাঁর পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী যখন প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদের ভেতরে অবস্থান করছে, তখন এই বইটির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার বিষয়টি দল ও দেশ উভয়ের জন্যই জরুরি। রীয়াজের মতে, সার্বভৌমত্বের তত্ত্বগত প্রশ্ন এবং আদর্শিক সংস্কারের যে দিকগুলো এই বইয়ে উঠে এসেছে, তা জামায়াতের নেতাদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
