সাধারণত সময়মতো এবং অগ্রিম কর প্রদানকে একজন আদর্শ নাগরিকের বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে নতুন অর্থ আইনের একটি বিশেষ নিয়মের কারণে বর্তমানে বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যাবে। আপাতদৃষ্টিতে এই সুবিধাটি আকর্ষণীয় মনে হলেও, এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমন এক জটিলতা রয়েছে যা নিয়ম মেনে চলা করদাতাদের জন্য হতাশাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনের বর্তমান শর্ত অনুযায়ী, এই বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে শুধুমাত্র রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়ে যে কর বকেয়া থাকে বা 'ট্যাক্স পেয়েবল', তার ওপর। অর্থাৎ, সারা বছর ধরে উৎসে কর বা অগ্রিম কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে যে টাকা জমা হয়েছে, তা বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট যে অংকটি থাকে, তার ওপর এই ছাড় হিসাব করা হবে। এই নিয়মের ফলে যারা বছরজুড়ে নিয়ম মেনে সম্পূর্ণ কর পরিশোধ করেছেন, তাদের বকেয়া কর শূন্য হওয়ায় তারা কোনো প্রকার ছাড় পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, যারা কর পরিশোধ করেননি বা যাদের প্রতিষ্ঠান কর কর্তন করেনি, তারা বকেয়া টাকার ওপর এই ছাড়ের সুবিধা ভোগ করছেন।

বিষয়টি পরিষ্কার করতে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস-এর পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া দুটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন। ধরা যাক, আরিফ এবং তানভীর দুজনেরই বার্ষিক আয় ১২ লাখ টাকা এবং মোট কর ৪৫ হাজার টাকা। আরিফের প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে প্রতি মাসে বেতন থেকে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে, ফলে বছর শেষে তার আর কোনো কর বকেয়া নেই। ফলস্বরূপ, ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে রিটার্ন জমা দিলেও আরিফ কোনো ছাড় পেলেন না। বিপরীতে, তানভীরের প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো কর কাটা হয়নি, তাই তার পুরো ৪৫ হাজার টাকাই বকেয়া ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এই বকেয়া টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে ২ হাজার ২৫০ টাকা ছাড় পেয়ে তানভীরকে শেষ পর্যন্ত ৪২ হাজার ৫০০ টাকা কর দিতে হলো। একই আয় এবং একই সময়ে রিটার্ন জমা দিয়েও কেবল নিয়ম না মানার কারণে তানভীর আর্থিক সুবিধা পেলেন, আর সৎ করদাতা আরিফ বঞ্চিত হলেন।

এই পরিস্থিতি শুধু চাকরিজীবীদের নয়, বরং সৎ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যারা বছরভর অগ্রিম কর দিয়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে কর্মচারীরা এখন তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপ দেবেন যাতে বেতন থেকে পুরো কর কর্তন করা না হয়। দীর্ঘমেয়াদে এতে সরকারেরই ক্ষতি হবে, কারণ আগাম কর না পেলে সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক বা অন্যান্য উৎস থেকে সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়, যা জাতীয় ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এই সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, ছাড়ের হিসাবটি 'বকেয়া করের' পরিবর্তে সারা বছরের 'মোট করের' ওপর করা হোক। এতে সকল করদাতা সমানভাবে সুবিধার আওতায় আসবেন এবং করদাতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হবে না।