২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে যে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছিল, তার ২৫ বছর কেটে গেছে। একটি সাধারণ সকাল মুহূর্তের মধ্যে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল যখন চারটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানো হয়। আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ যথাক্রমে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ ও সাউথ টাওয়ারে আছড়ে পড়ে। পরবর্তীতে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনে আঘাত হানে এবং ইউনাইটেডের ফ্লাইট ৯৩ পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এই নারকীয় হামলায় বিশ্বের ৯০টি দেশের মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন মানুষ প্রাণ হারান, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে নিউইয়র্কে। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ৩৪৩ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী এবং ৬০ জন পুলিশ সদস্যও জীবন উৎসর্গ করেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে নির্গত বিষাক্ত ধুলার কারণে পরবর্তী বছরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগে আক্রান্ত হন।

এই রক্তক্ষয়ী অভিযানের নেপথ্যে ছিল চরমপন্থী সংগঠন আল-কায়েদা। ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়া এই সংগঠনের প্রধান ওসামা বিন লাদেন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিশোধ নিতে এই হামলা পরিকল্পনা করেন। হামলাকারীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মার্কিন সমাজে মিশে গিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ এক বছর ধরে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং বিমানবন্দর নিরাপত্তার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তারা এই হামলা সফল করেন। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিল বাহিনীর অভিযানে বিন লাদেন নিহত হন।

হামলার পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত নাগরিকদের জন্য এক অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। সন্ত্রাসবাদের দোহাই দিয়ে মুসলিমদের ওপর নজরদারি, হয়রানি এবং ঘৃণামূলক অপরাধ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এফবিআই-এর তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে মুসলিমবিরোধী অপরাধ ১৬১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই ইসলামভীতি পরবর্তীকালে মার্কিন রাজনীতিতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে প্রতিকূলতার মাঝেও মার্কিন মুসলিমরা লড়াই করে সামনে এগিয়েছেন; বর্তমানে তারা কংগ্রেসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং দেশজুড়ে মসজিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই হামলা নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। মার্কিন ভাষ্যকার টাকার কার্লসনের দাবি, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এই হামলার কথা আগেই জানত। তিনি ‘ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্ট’ ইস্যুর কথা উল্লেখ করে জানান, কিছু ইসরায়েলি নাগরিক সন্দেহজনকভাবে সামরিক স্থাপনার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতেন। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি পুরনো মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক সংঘাতে ঠেলে দিয়েছে যা ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক।

৯/১১-এর প্রতিক্রিয়ায় জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন, যার ফলে আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, বহু দেশ তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন কঠোর করে। তবে ২০ বছর পর ২০২১ সালে তালেবান আবারও আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এই যুদ্ধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়, সন্ত্রাস দমনের নামে যে পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল, তা কি যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় এক ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার ফাঁদে ফেলে দিয়েছে?