দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ৮৩টি দ্বীপের সমষ্টি ভানুয়াতু। মাত্র তিন লাখ মানুষের এই ছোট্ট দেশটিতে বিদ্যমান ভাষাবৈচিত্র্য বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বিস্ময়কর। এখানে প্রায় ১১২টি স্বতন্ত্র ভাষা প্রচলিত। এক সময় ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের মানুষের মধ্যে ভাষাগত যোগাযোগের অভাব থাকলেও, বর্তমানে 'বিসলামা' নামক একটি সাধারণ ভাষার মাধ্যমে সেই দূরত্ব ঘুচেছে।
ভানুয়াতুর রাজধানী ও বৃহত্তম শহর পোর্ট ভিলাতে পৌঁছানোর পর প্রথম অভিজ্ঞতা হয় এর ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার। ১ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ১১৬ ভাতু পাওয়া গেলেও, নিত্যপণ্যের দাম ইউরোপের চেয়েও বেশি। তবে শহরের পরিচ্ছন্নতা এবং শৃঙ্খলার বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। রাস্তার দুধারে খুব বেশি ভিড় নেই এবং শহরের ভেতরে ছোট মাইক্রোবাসগুলোই প্রধান গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্কুলগামী শিশুদের রোদপোড়া গায়ের রঙ দেখে বোঝা যায়, তাদের জীবন সমুদ্র, বন ও আগ্নেয়গিরির প্রকৃতির সাথে মিশে আছে।
ঐতিহাসিকভাবে এই দেশটিতে ইংরেজ এবং ফরাসিদের উপনিবেশ ছিল। যদিও বিশ্বমঞ্চে এই দুই শক্তির সংঘাত প্রবল, কিন্তু ভানুয়াতুর শাসনকালে তাদের মধ্যে বেশ সখ্যতা ছিল। ১৯৮০ সালে দেশটি স্বাধীন হয়। সরকারি নীতি অনুযায়ী এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজি ও ফরাসি—উভয় ভাষাই বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হয়। নিরাপত্তার দিক থেকেও দেশটিকে বেশ নিরাপদ মনে হয়; স্থানীয়দের মতে, এখানে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা নেই এবং নারীরা সন্ধ্যার পর সাগরের পাড় ধরে নির্দ্বিধায় হাঁটতে পারেন।
ভানুয়াতুর সামাজিক জীবন ও অর্থনীতি স্থানীয় বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এই বাজারে কাসাভা, তারো এবং ইয়ামের মতো নানা ফল ও সবজি পাওয়া যায়। বিশেষত নারীরা এখানে উৎপাদক এবং বিক্রেতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেন এবং নিজেদের আয়ের ওপর পূর্ণ অধিকার রাখেন।
দেশটির কিছু অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, হাইডঅ্যাওয়ে দ্বীপে সমুদ্রের ১৫ ফুট নিচে একটি জলমগ্ন পোস্ট অফিস রয়েছে, যেখানে ওয়াটারপ্রুফ পোস্টকার্ড পাঠাতে হয় এবং ডুবসাঁতারুরা চিঠি পৌঁছে দেন। এছাড়া এখানকার প্রাচীন শাসন ব্যবস্থা 'চিফস নাকামাল' আজও টিকে আছে। এটি এমন এক বৃহৎ ঘর যেখানে গোত্রীয় নেতা ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ঘরের বিশেষ 'এ-ফ্রেম' ছাদ ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে সক্ষম। এখানে বসে স্থানীয় পানীয় 'কাভা' পান করা একটি সামাজিক রীতি।
খাদ্য সংস্কৃতির কথা বললে, কলাপাতায় মোড়ানো মাংস, কাসাভা, তারো ও ইয়ামের মিশ্রণে তৈরি 'লাপলাপ' এখানকার জাতীয় খাবার। এছাড়া বালির ওপর জ্যামিতিক নকশা আঁকার এক বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে, যার সাথে প্রাচীন দেবতা 'কাত'-এর মিথ বা পৌরাণিক কাহিনী জড়িত। পর্যটকদের জন্য কালচারেল ভিলেজে আদি পূর্বপুরুষদের জীবনধারা প্রদর্শন করা হয়, যা দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সাহায্য করছে।




