বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ, দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞ অভিনেতা জামিলুর রহমান বর্তমানে এক করুণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। চলচ্চিত্র অঙ্গনে 'শাখা ভাই' হিসেবে পরিচিত ৮৫ বছর বয়সী এই শিল্পী এখন অসুস্থ শরীর আর একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করছেন। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আলগীরচর গ্রামের পৈতৃক ভিটায় একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে তাঁর বর্তমান আবাস। দীর্ঘ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি এখন চরম অর্থকষ্ট এবং চিকিৎসার অভাবে ভুগছেন।
এক সময়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই বদলে যেতেন জামিলুর রহমান। তাঁর অভিনয় জীবনের পরিধি ছিল বিশাল; প্রায় ৬৫০টি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্রে না থাকলেও বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের মনে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। কখনো দরবেশ, কখনো বিচারক, আবার কখনো শ্রমজীবী মানুষের চরিত্রে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের নানা দিক। ১৯৬৮ সালে বিনোদন জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়, এরপর মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে তিনি হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ। বিশেষ করে 'খায়রুন সুন্দরী' চলচ্চিত্রে খায়রুনের বাবার চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অন্যতম স্মরণীয়।
বর্তমানে তাঁর জীবন যেন থমকে গেছে। একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে তিনি এখন কেবল স্ত্রীর সাহচর্যে দিন কাটাচ্ছেন। সোমবার দুপুরে তাঁর সাথে কথা বলার সময় তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, এক সময় শুটিংয়ের ব্যস্ততা, ক্যামেরার আলো এবং সহশিল্পীদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোই ছিল তাঁর জীবনের মূল ছন্দ। তবে সময়ের আবর্তে সেই সবকিছু বদলে গেছে। বর্তমানের নিঃস্ব জীবন নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন আর চলার মতো জীবনটুকুও যেন অবশিষ্ট নেই।
জামিলুর রহমানের এই করুণ অবস্থার কথা সামনে এনেছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সহশিল্পীরা। নবাবগঞ্জের প্রবীণ সাংস্কৃতিক কর্মী শফিকুর রহমান জানান, অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে এই শিল্পীর দেখাশোনা করার কেউ নেই। অন্যদিকে, যাত্রাশিল্পী এরশাদ আল মামুন বলেন, যে মানুষটি বছরের পর বছর বাংলা চলচ্চিত্রের অসংখ্য গল্পের অংশ হয়ে ছিলেন, তাঁর জীবনের বাস্তব গল্পটি এখন আড়ালে চলে গেছে। মঞ্চনাটক শিল্পী কৃষ্ণেন্দু সাহাও উল্লেখ করেন যে, মঞ্চে তাঁর অভিনয় ছিল স্মরণীয়, কিন্তু বর্তমানে নিরাপদ আবাস এবং চিকিৎসার অর্থের জন্য তিনি চরম সংকটে আছেন।
আনোয়ারা বেগম, শাবানা, ববিতা, আহমেদ শরীফ এবং আনোয়ার হোসেনের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতিগুলো এখনো তাঁর মনে অমলিন। তবে সেই রঙিন দিনগুলোর বিপরীতে এখন তাঁর সামনে বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে অসুস্থতা এবং দারিদ্র্য। যে শিল্পী পর্দায় অন্যের হাসি-কান্না ফুটিয়ে তুলেছেন, বাস্তব জীবনে তিনি এখন একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাসে দিন পার করছেন। কোনো নতুন কাজের ডাক নেই, নেই পরিচালকের 'অ্যাকশন' বলার শব্দ—কেবল আছে পুরোনো স্মৃতি আর একটি অসুস্থ শরীর।




