টেলিভিশন নাটক নির্মাণে চয়নিকা চৌধুরীর পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। 'শেষ বেলায়' নাটকের শুটিং দিয়ে সেই সূচনা। এরপর পেরিয়ে গেছে আড়াই দশক। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি নির্মাণ করেছেন চার শতাধিক নাটক। পাশাপাশি 'বিশ্বসুন্দরী' ও 'প্রহেলিকা'—দুটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন তিনি। তবে টেলিভিশন নাটক থেকে কখনো দূরে সরে যাননি। নির্মাণজীবনের ২৫ বছর পূর্তির দিনটি তিনি উদযাপন করছেন নতুন কাজ দিয়েই। আজ শুক্রবার একই দিনে চারটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে তাঁর চারটি নতুন নাটক।
এত বছর পরেও নতুন কাজের শুটিংয়ে নামার সময় প্রথম দিনের সেই অনুভূতিই ফিরে আসে বলে জানান চয়নিকা। তাঁর ভাষ্য, ২৫ বছর আগে যেভাবে দুরুদুরু বুকে কাজ শুরু করেছিলেন, আজও তা-ই হয়। কারণ, তিনি এখনো নিজের সেরা কাজটি দিতে পারেননি। আরও ভালো কিছু দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এই অতৃপ্তিই তাঁকে নিয়মিত নতুন কাজে ফিরিয়ে আনে। তাঁর বিশ্বাস, একজন নির্মাতার জন্য অর্জনের চেয়ে সামনে আরও ভালো কিছু করার তাগিদই বড়। তাই ২৫ বছর পূর্তিকে শুধু স্মৃতিচারণায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি।
পূর্তি উপলক্ষে নির্মিত চারটি নাটকের একটি 'সময় একটু থামো'। ইফফাত আরেফিন তন্বির লেখা নাটকটি প্রচার হচ্ছে চ্যানেল আইয়ে। এতে অভিনয় করেছেন আফজাল হোসেন, জাকিয়া বারী মম, রোজী সিদ্দিকী ও ফারজানা ছবি। টেলিভিশনে প্রচারের পর আগামীকাল গানচিলের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হবে এটি। এটিএন বাংলায় প্রচারিত হচ্ছে 'বিষণ্ন মেঘ'। চয়নিকার দেখা একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নাটকটি লিখেছেন তন্বি। অভিনয়ে রয়েছেন ইরফান সাজ্জাদ, জাকিয়া বারী মম, সাদিয়া আয়মান ও ডলি জহুর। পরে লেজার ভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে দেখা যাবে। শফিকুর রহমান শান্তনুর 'জোছনায় ফেরা' প্রচার হচ্ছে বৈশাখী টেলিভিশনে। ইরফান সাজ্জাদ, আইশা খান ও দীপা খন্দকার এতে অভিনয় করেছেন। আহমেদ তৌকীরের 'প্রথম দেখার পর' প্রচারিত হচ্ছে মাছরাঙা টেলিভিশনে। ইরফান সাজ্জাদ, তানজিন তিশা, আবুল হায়াত ও ডলি জহুরের অভিনয়ে নাটকটি পরে জি সিরিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেখা যাবে।
কোনো উৎসব বা বিশেষ দিবস ছাড়াই তাঁর ২৫ বছরকে ঘিরে চারটি চ্যানেল ও ইউটিউব প্ল্যাটফর্মের এমন আয়োজনকে বিশেষ প্রাপ্তি বলে মনে করছেন চয়নিকা। তিনি বলেন, এই দীর্ঘ পথ শুধু ভালোবাসা-সমর্থনে ভরা ছিল না। ঝড়ঝাপটা, কষ্ট, চোখের জল, অপমান ও অপবাদও ছিল। এমন পরিস্থিতিতে কোনো উৎসব ছাড়াই যখন চারটি চ্যানেল ও ইউটিউব তাঁর ২৫ বছর উদযাপনে এগিয়ে আসে এবং একই দিনে সব নাটক প্রচার হয়, সেটিই তাঁর জন্য আনন্দ ও অর্জন।
প্রথম নাটকের শুটিং 'শেষ বেলায়' হলেও এটি তাঁর প্রথম প্রচারিত নাটক নয়। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত 'এক জীবনে' তাঁর প্রথম প্রচারিত নাটক। অ্যাড মিডিয়া প্রযোজিত এ নাটকের প্রযোজক ছিলেন জায়েদান রাব্বী। প্রথমবার ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি লাইট অ্যান্ড শেডের মুজিবুর রহমান, অ্যাড মিডিয়ার জায়েদান রাব্বী ও তমালিকার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, যোগ্যতা থাকলেও উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম না পেলে তা দেখানোর সুযোগ তৈরি হয় না। ওই তিনজনই তাঁকে প্রথম প্ল্যাটফর্ম দিয়েছিলেন।
নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সালে 'বোধ' নাটক দিয়ে চিত্রনাট্যকার হিসেবে যাত্রা শুরু। সেখান থেকেই পরে নির্মাণে আসেন। শুরুর দিকে ইমদাদুল হক মিলন, মাহফুজ আহমেদ, অপি করিম, শ্রাবন্তী, শাহেদ, ঈশিতা ও জয়া আহসানের মতো অভিনয়শিল্পীরা তাঁর নাটকে কাজ করেছেন। তখন তাঁরা ছিলেন সুপারস্টার, আর তিনি নতুন নির্মাতা। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন চয়নিকা।
দীর্ঘ এই যাত্রায় তারিন জাহানের সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে নারী শিল্পীদের মধ্যে। সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি নাটক করেছেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। আবুল হায়াতের সঙ্গে কাজের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। প্রয়াত শর্মিলী আহমেদ তাঁর প্রায় ২৭০টি নাটকে অভিনয় করেছেন। ডলি জহুর অভিনয় করেছেন ২২৩টি নাটকে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করতে করতে তাঁদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
ছোটবেলায় রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন ছিল চয়নিকার। মিতা হক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও সঞ্জীদা খাতুন ছিলেন তাঁর আদর্শ। শান্তিনিকেতনেও গিয়েছিলেন গান শেখার জন্য। কিন্তু ১৯ বছর বয়সে বিয়ের পর সংসারের দায়িত্বে আর ফেরা হয়নি। তবু শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। লেখালেখি ও নির্মাণ—ভিন্ন পথে সেই শিল্পচর্চাই জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ তৈরিতেও মা-বাবার ভূমিকা ছিল। মায়ের হাত ধরে দেখেছেন সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের ছবি, বাবার সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিক সিনেমা। দুই ধারার চলচ্চিত্রের এই অভিজ্ঞতা পরে নিজের কাজে কাজে লেগেছে বলে মনে করেন তিনি। অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, মোস্তফা কামাল সৈয়দ, হুমায়ূন আহমেদসহ অনেকের কাজ থেকে শেখার চেষ্টা করেছেন। আফজাল হোসেনকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন, যাঁর কাছ থেকে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে নিয়মিত সমর্থন পেয়েছেন।
চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করলেও টেলিভিশন নাটক ছাড়তে চান না চয়নিকা। ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও কাজ করতে চান তিনি। তাঁর মতে, গল্প ভালো হলে ও নির্মাণ আন্তরিক হলে যেকোনো মাধ্যমেই দর্শকের কাছে পৌঁছানো যায়। দেশের চলচ্চিত্রের সুদিন ফেরাতে পর্যাপ্ত সিনেমা হল ও দর্শকবান্ধব পরিবেশও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। ২৫ বছর পেরিয়েও নিজেকে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া নির্মাতা মনে করেন না। সামনে আরও ভালো কাজের স্বপ্নই তাঁকে চালিত করছে। কাজই তাঁর একমাত্র প্রেম ও ভালোবাসা, যা তাঁর কাছে প্রার্থনার মতো।




