বৃষ্টিমুখর এক সন্ধ্যায় জাপানের ইউরাকুচোর হিউলিক হলে সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ৩৯তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ১০ দিন ধরে চলা এই উৎসবে হিবিয়া, গিনজা, মারুনৌচি ও ইউরাকুচোর মতো বিভিন্ন ভেন্যুতে মোট ২০৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মান ‘টোকিও গ্রাঁ প্রি—দ্য গভর্নর অব টোকিও অ্যাওয়ার্ড’ জয় করেছে উত্তর মেসিডোনিয়ার নির্মাতা মিলচো মানচেভস্কির পরিচালিত ‘সিস্টার ব্রাদার ম্যানহোল কাভার’ চলচ্চিত্রটি।

এই বিজয়ী চলচ্চিত্রটি মূলত দরিদ্র দুই ভাই-বোন মালিনা ও ভিক্টরের জীবনসংগ্রামের গল্প। উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিয়েতে তারা ম্যানহোল ঢাকনা ও ব্রোঞ্জের মূর্তি চুরি করে ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করে জীবনযাপন করে। গল্পের মোড় ঘোরে যখন একটি ভারী মূর্তি ভিক্টরের পায়ে পড়ে সে গুরুতর আহত হয় এবং ভাইয়ের চিকিৎসার তাগিদে মালিনার জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা এবং সম্পদের বৈষম্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই যৌথ প্রযোজনার ছবিতে ট্র্যাজেডি ও হাস্যরসের সংমিশ্রণ বিচারকদের মুগ্ধ করেছে। পরিচালক মিলচো মানচেভস্কি জানান, পার্ক থেকে জাতীয় বীরদের মূর্তি নিখোঁজ হওয়ার বাস্তব ঘটনা থেকেই এই গল্পের অনুপ্রেরণা পান তিনি। ছবির অভিনেত্রী সারা ক্লিমোস্কা ও অভিনেতা ফিলিপ ট্রাইকোভিচ জানান, চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কমেডির দৃশ্যগুলো ফুটিয়ে তুলতে তারা দীর্ঘ তিন সপ্তাহ মহড়া করেছেন। প্রযোজক ইয়ানে কর্তোশেভ রসিকতার সাথে বলেন, তারা টোকিওতে এসেছিলেন ম্যানহোল ঢাকনা নিয়ে, আর ফিরছেন একটি সুন্দর পুরস্কার নিয়ে।

পুরস্কারের অন্যান্য বিভাগে বৈচিত্র্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ জুরি পুরস্কার জিতেছে সুন শুনের সিঙ্গাপুরি চলচ্চিত্র ‘ম্যাজিক অ্যাটলাস’, যা উডকাট অ্যানিমেশনের মাধ্যমে ইতিহাস ও কল্পনার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। লিসান্দ্রো আলোনসো ‘ডাবল ফ্রিডম’ ছবির জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান। সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন ‘টু সিগারেটস, থ্রি নাইটস’-এর নারিতা রিয়ো এবং সেরা অভিনেত্রী নির্বাচিত হয়েছেন চীনা অভিনেত্রী হু লিং, যিনি ‘দ্য নাইট দ্যাট বাইন্ডস আস’ ছবিতে অভিনয় করেছেন। এছাড়া ইয়েলেনা ম্যাকসিমোভিচের ‘আনটিল দ্য ডে এন্ডস’ ছবির চিত্রগ্রহণ সেরা শিল্পগত অবদানের পুরস্কার পায় এবং তেওদোরা আনা মিহাইয়ের ‘হেইসেল ৮৫’ দর্শক পুরস্কার জয় করে। এশিয়ান ফিউচার বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে ‘শেরিফে তাভসান’। আফগান পরিচালক তারেক দাউদ জানান, দাদি-নানিদের অপূর্ণ স্বপ্ন ও ভালোবাসার অভিজ্ঞতা থেকে এই ছবির গল্প তৈরি হয়েছে।

নতুন চালু হওয়া ‘নিপ্পন সিনেমা নাউ’ বিভাগে সেরা হয় তানাকা মিকির ‘সিলভার এক্সপ্রেস’ এবং ‘আই রেয়ারলি ওয়েক আপ ড্রিমিং’ পায় টিএফ এথিক্যাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া কুরোসাওয়া আকিরা পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন মোহাম্মদ রাসুলোফ ও ও মিপো। এবারের উৎসবে প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে জায়গা করে নিয়েছিল রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত বাংলাদেশি ছবি ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’, তবে তা পুরস্কার জিততে পারেনি।

জুরিপ্রধান রলফ ডি হিয়ার সংবাদ সম্মেলনে জানান, ১৫টি চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে সেরাগুলো নির্বাচন করা চ্যালেঞ্জিং ছিল। তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে অর্থবহ চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি এবং এবারের প্রদর্শিত ছবিগুলোতে সেই বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা গেছে। উৎসবের সমাপনী চলচ্চিত্র ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কলোনি’। প্রদর্শনী ছাড়াও মাস্টারক্লাস, ‘টোকিও টক’ এবং ‘একাডেমি ইন টোকিও’র মতো বিশেষ সংলাপের আয়োজন ছিল। উৎসব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারের দর্শকসংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৭২ জন, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। আগামী বছর ৪০তম আসরকে আরও প্রাণবন্ত করার অঙ্গীকার জানিয়ে উৎসব পরিচালক হিসামাৎসু তাকেও আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।