দীর্ঘ ২৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল ফিরদৌসী খাতুনের, তবে সেই দেখা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। জীবনের শেষ সময়ে বাবার মুখ দেখার আকুতি পূর্ণ হলেও, তিনি তখন আর জীবিত নেই। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার স্বাধীনতা সড়কের ১০৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতিতে বাবার নিথর দেহের সামনে দাঁড়ান ফিরদৌসী।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হৃদয়পুর গ্রামের বাসিন্দা মোনরুদ্দিন শেখের বড় মেয়ে ফিরদৌসী। প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয় মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের সোনাপুর নতুনপাড়ার বাসিন্দা ইসরাফিলের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকেই তিনি সেখানেই সংসার করেন। ফিরদৌসীর স্মৃতিতে, তাঁর বিয়ের সময়ে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, ফলে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত ছিল সহজ। তবে সময়ের সাথে পরিস্থিতি বদলে যায়।
পারিবারিক টানাপোড়েন এবং চরম অভাবের কারণে পাসপোর্ট-ভিসার খরচ জোগাতে পারেননি ফিরদৌসী। ফলে বছরের পর বছর বাবার কাছে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ২০০০ সালের মার্চ মাসে একবার স্বামীসহ ভারতে গেলেও, অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁর স্বামীকে ভারতীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেই ঘটনার পর থেকে আর ভারতে যাননি তিনি। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে ইমো-র মাধ্যমে নিয়মিত বাবা ও ভাইদের সাথে কথা বলতেন এবং ভিডিও কলে বাবার মুখ দেখতেন।
গত সাত বছর ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় শয্যাশায়ী ছিলেন মোনরুদ্দিন শেখ। সম্প্রতি তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখার আকুতি জানান ফিরদৌসী। এই মানবিক আবেদনের প্রেক্ষিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে সীমান্তের শূন্যরেখায় মরদেহ দেখার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এই প্রক্রিয়ায় ভারতের পক্ষ থেকে মোনরুদ্দিন শেখের মরদেহ নিয়ে আসেন স্বজনরা এবং বাংলাদেশ থেকে সেখানে উপস্থিত হন ফিরদৌসী। পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন বিজিবির মুজিবনগর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার এনায়েত হোসেন এবং বিএসএফের এএসআই সুনীল কুমারের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের একটি দল। চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, পরিবারের আবেদন এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই ধরণের বিশেষ পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকে।




