বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন বন্ড মার্কেটে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সোমবার মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড সাময়িকভাবে ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ২০২৩ সালের পর এই প্রথম। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ইরান যুদ্ধের আগে এই হার ছিল ৪ শতাংশের নিচে; অর্থাৎ গত কয়েক মাসে বন্ড ইল্ড ১০০ বেসিস পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ইরান যুদ্ধের সপ্তম মাস চললেও হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি না হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম চড়া থাকছে। বর্তমান পরিস্থিতি ইরান যুদ্ধের চরম সময়ের চেয়েও জটিল বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে কিছু তেল পরিবহন হচ্ছে, তবে তা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা মার্কিন তেল মজুদ আরও দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে বাবে আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুথি বিদ্রোহীদের আধিপত্য এবং ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর প্রভাবে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১১০ ডলারে পৌঁছেছে, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। জ্বালানি খরচের এই দীর্ঘমেয়াদী উচ্চমূল্যের সম্ভাবনা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার বন্ড ইল্ডও লাফিয়ে বেড়েছে। এই সংকট এমন এক সময়ে এল যখন ফেডারেল রিজার্ভ আগামী বুধবার সুদের হার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের গ্রুপ চিফ ইকোনমিস্ট নীল শেয়ারিং সতর্ক করে বলেছেন, উচ্চ সরকারি ঋণ এবং বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির এই সময়ে বন্ড মার্কেটের মাধ্যমে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। গত পাঁচ বছর ধরে মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি ফেডারেল রিজার্ভের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার উপরে রয়েছে। ফলে এখন নীতিনির্ধারকরা আর অপেক্ষা করতে চাইছেন না। ওয়াল স্ট্রিটের অনেক বিশ্লেষকের মতে, ফেডারেল রিজার্ভ মোট তিনবার সুদের হার বাড়াতে পারে। সুদের হার বাড়লে বন্ড ইল্ড আরও বাড়বে, যা সরকারের জন্য বিশাল ঘাটতি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা ব্যয়বহুল করে তুলবে। শেয়ারিংয়ের মতে, যদিও বর্তমানে নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ঋণ পরিশোধের খরচের চেয়ে বেশি হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনই পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সংকটে পড়েনি, তবে ঋণের বোঝা থাকা দেশগুলো এই ধরনের সরবরাহ সংকটে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ড ৫ শতাংশ ছাড়ানো প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চিপ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম সোমবার হ্রাস পেয়েছে। রকেফেলার ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান রুচির শর্মা সতর্ক করেছেন যে, ডটকম যুগের পর থেকে ৫ শতাংশের এই সীমাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বুদবুদ ফেটে যেতে পারে। কারণ উচ্চ ঋণ খরচের ফলে হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলো বন্ড ইস্যু করা কমিয়ে দেবে এবং নতুন ইক্যুইটি সংগ্রহে সমস্যার সম্মুখীন হবে। শর্মা আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা জিডিপি-র ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, ফলে ঋণ পরিশোধের খরচ এখন অনেক বেশি। ফলে সরকারি ঋণের খরচ বাড়লে তা সাধারণ ঋণগ্রহেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং এআই বাজারের মতো উচ্চমূল্যের খাতগুলোতে বড় ধাক্কা দেবে।
তেলমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মার্কিন বন্ড ইল্ড ৫ শতাংশ ছাড়াল, ঝুঁকিতে অর্থনীতি
তেলমূল্যের আকস্মিক বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৫ শতাংশের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং সরকারি ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।




