১৯৮৫ সালে নিজের প্রতিষ্ঠিত অ্যাপল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর স্টিভ জবস থেমে যাননি। পরের বছর তিনি জর্জ লুকাসের লুকাসফিল্মের কম্পিউটার গ্রাফিকস বিভাগ কিনে সেটিকে স্বাধীন কোম্পানি হিসেবে গড়ে তোলেন—নাম দেন পিক্সার। সেখানে তখন প্রায় ৪০ জন কর্মী ছিলেন, যাদের মধ্যে এড ক্যাটমুল, অ্যালভি রে স্মিথ ও জন ল্যাসেটার উল্লেখযোগ্য। তাঁরা ইতিমধ্যে ‘স্টার ট্রেক ২: দ্য রাথ অব খান’–এর বিখ্যাত ‘জেনেসিস ইফেক্ট’ দৃশ্যসহ চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার গ্রাফিক্স তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু পিক্সারের শুরুটা সিনেমা স্টুডিও হিসেবে হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসা ছিল উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিক্স কম্পিউটার ও সফটওয়্যার তৈরি; তাদের পিক্সার ইমেজ কম্পিউটার চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্রে উন্নত ভিজ্যুয়ালাইজেশনের লক্ষ্য নিয়ে বাজারে আসে। সমস্যা ছিল, এই ব্যবসা প্রত্যাশামতো চলছিল না।
তবু জবস কোম্পানিটি বন্ধ করেননি। কারণ, ভেতরে অন্য একটি সম্ভাবনা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। ল্যাসেটার কম্পিউটার অ্যানিমেশন নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ১৯৮৬ সালের লাক্সো জুনিয়র সেই পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ফল—ছোট্ট ডেস্ক ল্যাম্পের দুই চরিত্রকে কেন্দ্র করে তৈরি এই অ্যানিমেশন দেখিয়ে দেয়, কম্পিউটার দিয়ে শুধু গ্রাফিক্স নয়, চরিত্র ও আবেগও ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। এই কাজ জবসকে পিক্সারের অ্যানিমেশন সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও বিশ্বাসী করে তোলে। এরপর পিক্সার ছোট অ্যানিমেশন ও কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কাজ করতে থাকে। ১৯৮৮ সালে টিন টয় একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে ইতিহাস তৈরি করে—এটি ছিল প্রথম কম্পিউটার অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার জয়ের ঘটনা। কিন্তু পুরস্কার পেলেও পিক্সারের ব্যবসায়িক সংকট কাটেনি। তৎকালীন প্রধান অর্থ কর্মকর্তা লরেন্স লেভির বর্ণনা অনুযায়ী, জবস কোম্পানিতে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে নগদ অর্থের ঘাটতি সামলান। তবু তিনি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করেননি, কারণ ল্যাসেটার ও তাঁর দলের সামনে ছিল আরও বড় একটি স্বপ্ন—কম্পিউটার দিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করা।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সেই স্বপ্নই ‘টয় স্টোরি’–এ রূপ নিতে শুরু করে। তখনকার তুলনায় কম্পিউটার অ্যানিমেশনের প্রযুক্তি ছিল অনেক বেশি সীমিত, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। একটি সিনেমার প্রতিটি চরিত্র, সেট, খেলনা, আলোছায়া ও ক্যামেরার গতিবিধি কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরি করতে হতো। এটি ছিল পিক্সারের জন্য বিশাল ঝুঁকি। সফল হলে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ নতুন একটি শিল্পের দুয়ার খুলতে পারবে; তবে ব্যর্থ হলে জবস হারাবেন তাঁর এত দিনের বিশাল বিনিয়োগ। ল্যাসেটার ছিলেন ছবিটির পরিচালক ও প্রধান সৃজনশীল শক্তি, আর ক্যাটমুল ছিলেন এর প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। জবসের কাজ ছিল তাঁদের সেই ঝুঁকি নেওয়ার মতো অর্থ, সময় ও স্বাধীনতা দেওয়া।
তবে পিক্সারের কাছে প্রযুক্তি থাকলেও একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাকে বড় পর্দায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য দরকার ছিল বড় কোনো স্টুডিও। সেই জায়গায় আসে ডিজনি। ১৯৯১ সালের মে মাসে পিক্সার ও ডিজনি একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র চুক্তি করে, যার অধীনে সর্বোচ্চ তিনটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা হয়। সেই চুক্তির প্রথম সিনেমাই ছিল ‘টয় স্টোরি’। চুক্তি হয়ে গেলেও ছবিটির কাজ সহজ ছিল না। প্রথম দিকের দৃশ্য ডিজনির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি; গল্পের আবহ ও চরিত্রগুলোর আচরণ নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়। একপর্যায়ে ডিজনি পিক্সারকে ছবিটির গল্প ও চরিত্রগুলো নতুন করে সাজানোর জন্য কাজ থামিয়ে দিতে বলে। পুনর্লিখন ও পুনর্গঠনের পর উডি ও বাজ লাইটইয়ারের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে—একজনের নিজের জায়গা হারানোর ভয় এবং অন্যজনের নিজেকে সত্যিকারের মহাকাশযোদ্ধা মনে করার ভুল ধারণা থেকেই তৈরি হয় দ্বন্দ্ব, যা শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বে রূপ নেয়।
এরপর আসে ২২ নভেম্বর ১৯৯৫। মুক্তি পেল ‘টয় স্টোরি’। টম হ্যাঙ্কসের কণ্ঠে উডি ও টিম অ্যালেনের কণ্ঠে বাজ লাইটইয়ারকে ঘিরে ছবিটি দর্শকদের সামনে এমন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে, যেখানে সম্পূর্ণ কম্পিউটার–নির্মিত চরিত্রও মানুষের মতো ভয়, ঈর্ষা, আবেগ ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করতে পারে। ‘টয় স্টোরি’ ছিল বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কম্পিউটার অ্যানিমেটেড পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবিটি তিনটি অস্কার মনোনয়ন পায় এবং জন ল্যাসেটার পান বিশেষ সম্মাননা। প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের নির্মাণ বাজেট নিয়ে তৈরি ছবিটি বিশ্বব্যাপী ৩৬৫ মিলিয়নের বেশি ডলার আয় করে এবং ১৯৯৫ সালের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমায় পরিণত হয়। পিক্সারের যে কোম্পানিকে জবস বছরের পর বছর নিজের অর্থ দিয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন, সেই কোম্পানির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাই হয়ে গেল ব্লকবাস্টার।
‘টয় স্টোরি’ মুক্তির মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পিক্সার শেয়ারবাজারে প্রবেশ করে। ২৯ নভেম্বর ১৯৯৫ পিক্সার প্রাথমিক আইপিও শেয়ারপ্রতি ২২ ডলার প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করে। লেনদেন শুরুর পর দাম ৪৯ দশমিক ৫০ ডলার পর্যন্ত ওঠে এবং দিন শেষে ৩৯ ডলারে বন্ধ হয়। কোম্পানির বাজারমূল্য প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট সেই সময়ের প্রতিবেদনে শিরোনাম দেয়—পিক্সারের শেয়ার বিক্রি স্টিভ জবসের জন্য বড় সাফল্য। শেয়ারবাজারে এই সাফল্যের মাধ্যমে জবসের ব্যক্তিগত সম্পদও দ্রুত বেড়ে যায় এবং তিনি বিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠেন। অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যাওয়া জবস পিক্সারের সাফল্যের মাধ্যমে আবারও বড় ব্যবসায়িক শক্তি হিসেবে ফিরে আসেন।
‘টয় স্টোরি’ ছিল শুধু শুরু। এরপর ‘আ বাগস লাইফ’, ‘টয় স্টোরি ২’, ‘মনস্টারস ইনক’ ও ‘ফাইন্ডিং নিমো’র মতো একের পর এক সাফল্যে পিক্সার অ্যানিমেশন–জগতের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। একই সময়ে জবসের আরেক প্রতিষ্ঠান নেক্সটও তাঁকে আবার অ্যাপলের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করছিল। ১৯৯৬ সালে অ্যাপল নেক্সট অধিগ্রহণ করে। এর মাধ্যমেই জবসের আবার অ্যাপলে ফিরে আসার পথ তৈরি হয়। অর্থাৎ অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তৈরি করা দুই আলাদা উদ্যোগ—নেক্সট ও পিক্সার—তাঁর প্রত্যাবর্তনের ভিত্তি তৈরি করছিল।
শেষ পর্যন্ত পিক্সারের সাফল্য তাকে ডিজনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করে। কিন্তু সম্পর্ক শুধু অংশীদারত্বে আটকে থাকেনি। ২০০৬ সালে প্রায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ডিজনি পিক্সারকে অধিগ্রহণ করে। চুক্তির ফলে স্টিভ জবস ডিজনির প্রায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়ে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় একক ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডার হয়ে ওঠেন। তিনি ডিজনির পরিচালনা পর্ষদেও যোগ দেন। ৩০ বছর বয়সে নিজের তৈরি অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যাওয়া জবস কয়েক বছর পর এমন একটি প্রতিষ্ঠানে বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন, যার ভবিষ্যৎ তখনো অনিশ্চিত। সেই পিক্সারই তৈরি করল ‘টয় স্টোরি’। আর সিনেমাটির সাফল্য জবসকে শুধু বিলিয়নিয়ারই বানায়নি, তাঁর ব্যবসায়িক বিচারবোধকেও নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এ কারণেই ‘টয় স্টোরি’ শুধু অ্যানিমেশনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক নয়; এটি স্টিভ জবসের জীবনের এক অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প। সম্প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিটির পঞ্চম কিস্তি ওটিটিতে আসায় এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আজও নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
পিক্সারডটকম, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, অস্কারডটওআরজি ও দ্য নামবার ডটকম অবলম্বনে




