সংগীতশিল্পী থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতায় রূপান্তর ঘটিয়ে বর্তমানে আলোচনায় পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের গ্লিটজ সিরিজ 'আড্ডানামার'-এর একাদশ পর্বে অতিথি হয়ে তিনি তাঁর শিল্পীজীবন, চলচ্চিত্র নির্মাণ ভাবনা এবং ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান সংকট নিয়ে কথা বলেন। অভিনেত্রী নিকিতা নন্দিনীর সঞ্চালনায় এই আলাপচারিতায় সুমন তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র 'রইদ'-এর অস্কারের ৯৯তম আসরের ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম বিভাগে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়ে জানান।

সুমন জানান, তাঁর প্রথম সিনেমা 'হাওয়া' কোভিড মহামারির পর দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছিল, যাকে তিনি একটি 'শিক্ষা' বা 'পরীক্ষা' হিসেবে দেখেন। আর 'রইদ' সিনেমাটি তিনি নির্মাণ করেছেন দর্শকদের মনে গভীর বিশ্লেষণ ও আলোচনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। মায়ের কাছ থেকে শোনা গল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সিনেমাটি তাঁর কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত। তিনি বিশ্বাস করেন, এই অঞ্চলের মানুষের আবেগ, চেতনা ও বিশ্বাস তাঁর গল্পের মূল চালিকাশক্তি।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে 'মেঘদল' ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও গায়ক হিসেবে পরিচিত সুমন জানান, তাঁর মনে সবসময়ই চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবল ইচ্ছা ছিল। যদিও সংগীতের প্রতি তাঁর টান এখনও আছে এবং কিছু গানের রেকর্ডিং চলছে, তবে দীর্ঘ বিরতির কারণে তিনি এখন কিছুটা দ্বিধায় আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়ার সময় চিত্রশিল্পী রফিকুন নবীর কাছ থেকে শেখা 'সবচেয়ে সুন্দর করে ভাঙার' দর্শনকে তিনি তাঁর চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।

নির্মাণশৈলীর ক্ষেত্রে সুমন প্রতিটি উপাদানকে কেবল প্রপস নয়, বরং একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। 'রইদ' সিনেমার শুটিংয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে যখন একটি যত্ন করে বানানো সেট পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, তখন পুরো টিম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল এবং দীর্ঘ এক বছরের স্মৃতি হারানোর শোকে কেঁদেছিল। লোকজ উপাদান ও মিথের প্রতি তাঁর ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল, যা তাঁর পারিবারিক গল্পের মাধ্যমে সিনেমার পর্দায় উঠে এসেছে।

চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুমন জানান, তিনি প্রোপাগান্ডার চেয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশে বিশ্বাসী। সমকালীন সমাজে অন্যের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করার প্রয়োজনীয়তা এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে তিনি সতর্কবার্তা দেন। পাশাপাশি ঢাকাই সিনেমার পরিকাঠামো নিয়ে তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে এফডিসিতে আধুনিক সাউন্ড মিক্সিং বা কালার গ্রেডিং স্টুডিওর অভাব এবং স্বাধীন নির্মাতাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সমর্থনের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষ যেন কম মূল্যে এবং ভালো পরিবেশে সিনেমা দেখতে পারে, সেজন্য টিকেট মূল্য ২০০-২৫০ টাকার মধ্যে রাখা এবং জেলা পর্যায়ে ভালো প্রেক্ষাগৃহ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং নিরীক্ষাধর্মী সিনেমার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আশাবাদী সুমন। তাঁর মতে, দর্শককে প্রস্তুত করতে হয় এবং একজন নির্মাতার কাজ হলো দর্শককে একটু ফিউচারিস্টিক চিন্তায় নিয়ে যাওয়া। 'রইদ' সিনেমার ব্যবসায়িক সাফল্য প্রমাণ করেছে যে দর্শক এখন ভিন্ন চিন্তার সিনেমা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তবে আগামীতে তিনি লোকজ উপাদানের বাইরে গিয়ে 'শহুরে জীবনের কোলাহল' নিয়ে তৃতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন।