টাঙ্গাইল শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত সন্তোষ এলাকাটি কেবল জমিদারবাড়ির স্মৃতি নয়, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা এবং রাজনীতির এক সংমিশ্রিত ইতিহাসের সাক্ষী। ব্রিটিশ আমলের আগে 'খোশনদপুর' নামে পরিচিত এই জনপদের মূল রূপকার ছিলেন দূরদর্শী নারী জমিদার শ্রীমতী জাহ্নবী চৌধুরাণী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পর তিনি এই জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তৎকালীন সামাজিক বাধা কাটিয়ে প্রজাদের জীবনমানোন্নয়নে মনোনিবেশ করেন।
শিক্ষার প্রসারে তাঁর অনন্য অবদান ছিল ১৮৭০ সালের ৩ জুন প্রতিষ্ঠিত 'সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চবিদ্যালয়'। নিজের বসতবাড়ির সাড়ে চার একর জমিতে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে টাঙ্গাইল জেলার প্রাচীনতম এবং তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার দ্বিতীয় প্রাচীনতম উচ্চবিদ্যালয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শণের ঘরে শুরু হলেও পরে এখানে বিশাল শিক্ষাঙ্গন, পাঠাগার ও বিজ্ঞানাগার তৈরি হয়। পাঠাগারে ৩৬ খণ্ডের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাসহ বহু দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ করা হয়েছিল। এছাড়া ১৮৭৩ সালে পি সি সেন এমএ-র সহযোগিতায় এখানে একটি সূর্যঘড়ি স্থাপন করা হয়, যা ছিল সে সময়ের এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। স্থাপত্যের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য ছিল এই বিদ্যালয়ের ১০১টি দরজা বিশিষ্ট জানালাবিহীন প্রাসাদোপম ভবনটি।
চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও জাহ্নবী চৌধুরাণীর উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। তিনি এখানে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী সময়ে যক্ষ্মা নিরাময় কেন্দ্র বা টিবি ক্লিনিক হিসেবে পরিচিতি পায়। ঔপনিবেশিক আমলের নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ভবনটি আজও কার্যকর রয়েছে। বর্তমানে এটি একটি ২৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতাল হিসেবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রোগীদের সেবা প্রদান করছে। এছাড়া স্থাপনা নির্মাণের সময় মাটি কেটে তৈরি হওয়া ইংরেজি 'টি' অক্ষরের আকৃতির একটি বিশাল জলাশয় বা 'টি পন্ড' আজও স্থানীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
জাহ্নবী চৌধুরাণীর পর তাঁর পুত্রবধূ রানি দিনমণি রায় চৌধুরাণীও জনহিতকর কাজের ধারা অব্যাহত রাখেন। তিনি দার্জিলিংয়ে বৈকুণ্ঠনাথ থায়সিস ওয়ার্ড, ঢাকায় বৈকুণ্ঠনাথ আশ্রম এবং মিটফোর্ড হাসপাতালে নারীদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ড নির্মাণ করেন। এছাড়া কাগমারীতে মহাশ্মশান ঘাট ও দাতব্য কাঠের ভান্ডার স্থাপনের মাধ্যমে তিনি তাঁর মানবসেবা বিস্তৃত করেন।
সন্তোষের এই মাটির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্মকথা। একদিকে যেখানে জমিদারির পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষা ও চিকিৎসার বিকাশ ঘটেছিল, অন্যদিকে এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছেন সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলা এক প্রভাবশালী নেতা। এছাড়া ভারতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি স্যার মন্মথনাথ রায় চৌধুরীর সম্মানার্থে আজও ভারতে ঐতিহ্যবাহী 'সন্তোষ ট্রফি' ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়। এভাবে সন্তোষ এলাকাটি হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইলের এক দীর্ঘ স্মৃতির সমাধিলিপি, যেখানে নারী নেতৃত্বের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল এক জনকল্যাণমুখী সমাজ।




