গণিতশাস্ত্রের অন্যতম কঠিন ও রহস্যময় সমস্যা হিসেবে পরিচিত 'নাভিয়ে-স্টোকস' সমীকরণের সমাধান দাবি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। ১৯ শতকে তরলের প্রবাহ বোঝার উদ্দেশ্যে তৈরি এই সমীকরণটি আবহাওয়া পূর্বাভাস, সমুদ্রস্রোতের গতিপ্রকৃতি এবং উড়োজাহাজের ডানার ওপর বাতাসের চাপের মতো জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়। তবে বাস্তব জগতের সঙ্গে এই সমীকরণের সমাধান সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে সংশয় ছিল গণিতবিদদের।
এই সমস্যাটি সমাধানে ওপেনএআই প্রায় ১০ হাজার এআই এজেন্টের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়োগ করে। টানা ৮৮ ঘণ্টা বা প্রায় চার দিন নিরবিচ্ছিন্ন কাজ করার পর তারা একটি সমাধানে পৌঁছায়। এরপর আরও ১৭ ঘণ্টা ধরে সেই ফলাফলটি যাচাই-বাছাই করা হয়। চূড়ান্তভাবে তারা ১৬৬ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ সমাধানপত্র প্রকাশ করেছে। তবে এই ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ জাভিয়ার গোমেজ সেরানো উল্লেখ করেছেন যে, কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রাপ্ত এই সমাধানটি মানুষের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। তাঁর মতে, গাণিতিক সমাধানের ক্ষেত্রে কেবল সঠিক হওয়া যথেষ্ট নয়, বরং তা মানুষের বোধগম্য হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই সাফল্য নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রিস্টান বাকমাস্টার এবং অ্যানথ্রোপিকের গণিতবিদ লেভেন্ট আলপোগে এই সমীকরণটি সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। অধ্যাপক বাকমাস্টারের অভিযোগ, ওপেনএআই তাঁর গবেষণার গোপন তথ্যের নাগাল পেয়েছিল, কারণ ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টগুলো ঠিক সেই পথেই এগিয়েছে যা তিনি পরবর্তী ধাপে পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও ওপেনএআই তদন্তের দাবি করে জানিয়েছে যে, বাকমাস্টারের তথ্যের কোনো প্রভাব তাদের সমাধানে পড়েনি, তবে অধ্যাপক বাকমাস্টার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে অবিশ্বাস করেন।
এআই-এর এই অগ্রগতির ফলে গণিতের ভবিষ্যৎ এবং বিজ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেস বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ টেরেন্স টাও। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এ ধরনের ঘটনায় গবেষকরা তাঁদের নতুন আবিষ্কার অন্যদের সাথে শেয়ার করতে দ্বিধাবোধ করতে পারেন, যা দীর্ঘদিনের উন্মুক্ত বিজ্ঞানচর্চার রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একইসঙ্গে অধ্যাপক বাকমাস্টার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ওপেনএআই-এর এই সাফল্যের ভিত্তি হলো গত কয়েক দশকের গণিতবিদদের তৈরি করা তাত্ত্বিক কাঠামো। তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অবদানের ওপর ভিত্তি করেই এআই এই সমাধানে পৌঁছাতে পেরেছে।




