বাংলা সাহিত্যের জাপানি অনুবাদক কিওকো নিওয়ার স্মৃতিচারিতায় ফুটে উঠেছে প্রথিতযশা কবি শামসুর রাহমানের এক মানবিক ও সহজচেতনার রূপ। ২০০৬ সালে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি লেখায় তিনি কবির সাথে তাঁর প্রথম ও শেষ সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। ১৯৯৩ সালে কলকাতায় থাকাকালীন ‘হরিণের হাড়’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে কবির সাথে নিওয়ার প্রথম পরিচয় হয়। এই বইটির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের কবিতার জগতের সাথে তাঁর গভীর সংযোগ স্থাপিত হয় এবং তা তাঁকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী সময়ে গবেষক হিসেবে জাপানে বাংলা সাহিত্যের পরিচয় তুলে ধরার প্রচেষ্টায় তিনি নিয়োজিত হন।

নিওয়া জানান, অনুবাদক হিসেবে যখন তিনি এক ধরনের নিঃসঙ্গতা ও হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন শামসুর রাহমানের ‘শ্রোতা’ কবিতাটি তাঁকে নতুন করে শক্তি জোগায়। কবিতাটির নির্জনতা ও প্রকৃতির প্রতি আকুলতা তাঁকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল যে, প্রকৃতিই হতে পারে প্রকৃত শ্রোতা। এই অনুভূতির কারণেই কবি শামসুর রাহমানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ আসায় তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাপান ফাউন্ডেশনের কাজে ঢাকা এসে বিখ্যাত প্রকাশক মফিদুল হকের সহায়তায় কবির সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। কবির বয়স হয়েছিল, হাত কাঁপছিল এবং শুরুর দিকে নিওয়ার অগোছালো বাংলা বুঝতে তাঁর কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। তবে আলাপচারিতা শুরু হলে নিওয়া কবির ভেতরে এক অসাধারণ প্রাণশক্তি খুঁজে পান, যা মুহূর্তেই তাঁর বয়সের ছাপ মুছে দেয়।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে কবি তাঁর কবিজীবনের শুরুর দিনগুলোর গল্প শুনিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে লেখা একটি দীর্ঘ কবিতা নিয়ে তিনি প্রথমবার এক পত্রিকা অফিসে গিয়েছিলেন। সেখানে খদ্দরের জামা পরিহিত এক সুদর্শন সম্পাদকের সামনে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে কবিতাটি জমা দিয়েছিলেন। সম্পাদক প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও পরে কবিতাটি পড়ে তাকে বসতে বলেন এবং আগামী সপ্তাহেই তা ছাপার আশ্বাস দেন। এভাবেই শুরু হয়েছিল তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা। নিওয়ার প্রশ্নের উত্তরে কবি জানান, তাঁর রচনার মূল উৎস হলো ‘জীবন’ এবং এর সাথে যুক্ত মৃত্যু, ভালোবাসা ও ঘৃণা। শিল্পী হিসেবে তিনি যা অনুভব করেছেন, তাই তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

তরুণ কবিদের প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানের মতামত ছিল স্পষ্ট। তিনি মনে করতেন, অনেকে লিখছেন কিন্তু অনেকেই জানেন না আসলে তারা কী লিখছেন; কেউ কেউ কেবল চমক দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অসংলগ্ন কথা বলেন। তবে এর মাঝে কিছু কবি ঠিকই ভালো লিখছেন এবং কবিতার ধারাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। নিওয়া লক্ষ্য করেন, কবির সরলতা ও অকপটতা অত্যন্ত মুগ্ধ করার মতো ছিল। শেষ সময়ে কবির অনুমতি নিয়ে জাপানে একটি বাংলা কবিতা সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা করেন তিনি, যেখানে শামসুর রাহমান থাকবেন প্রধান কবি হিসেবে। কবির অকাল প্রয়াণের পর নিওয়া গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, কবির জীবন সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানার ছিল তাঁর। তবে কবির শারীরিক অস্তিত্ব মুছে গেলেও তাঁর কবিতার শক্তি চিরকাল অমলিন থাকবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।