ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন ও আধুনিক রেডার ব্যবস্থা এবং আকাশসীমা ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রযুক্তিগত কার্যক্রম চালুর ফলে বড় ধরনের আর্থিক সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। মূলত বিদেশি উড়োজাহাজ যখন বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে চলে যায়, তখন নির্দিষ্ট ফি বা ‘ওভারফ্লাই ফি’ প্রদান করতে হয়। সম্প্রতি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত তিন বছরের তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, প্রতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে এই রাজস্ব আয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৬ সালে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ওভারফ্লাই ফি বাবদ মোট ২৬৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা আয় হয়েছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩২১ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। এরপর ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে এই আয়ের পরিমাণ আরও ২৭ কোটি টাকার বেশি বেড়ে হয় প্রায় ৩৪৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। মাসভিত্তিক হিসাবেও এই প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আয় ছিল ৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে ৬৭ কোটি ৯৩ লাখ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেড়ে ৮০ কোটি ১৬ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। একইভাবে ফেব্রুয়ারি, মার্চ এবং মে মাসেও আয়ের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বমোট ৮০৫ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৬৫ টাকা ওভারফ্লাই ফি হিসেবে অর্জিত হয়েছে, যার মধ্যে জানুয়ারি-জুন ২০২৬ মেয়াদে আয় হয়েছে ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ ৪৪ হাজার ৯১৪ টাকা এবং জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ মেয়াদে ৩৮৮ কোটি ১০ লাখ ১৫ হাজার ৪৫১ টাকা।

এই আয় বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে꼽ছেন এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা। ২০২১ সালের এপ্রিলে সরকার সিএনএস-এটিএম (কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স-এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প অনুমোদন করে, যার আওতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অত্যাধুনিক রেডার সিস্টেমের কাজ শেষ হয় এবং ২০ এপ্রিল এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জানান, নতুন রেডার সিস্টেমের কারণে আকাশসীমার নজরদারি অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে, ফলে আগে যে আয় থেকে সরকার বঞ্চিত হতো, এখন তা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মুখপাত্র মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ জানান, নজরদারি বাড়ার পাশাপাশি ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স, ফিটস এয়ার এবং রিয়াদ এয়ারের মতো নতুন কিছু এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করায় আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, আয়ের এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও আরও সম্ভাবনা রয়ে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, পুরনো ম্যানুয়াল সিস্টেমের বদলে এখন ব্যবহৃত থ্যালিস-এর আধুনিক রেডার সিস্টেম অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতা ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর প্রভাবের কারণে রেডারের পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করে পুরো সীমানা কাভার করা সম্ভব হচ্ছে না। তার মতে, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইকাও এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে পারলে আকাশসীমার সম্পূর্ণ তদারকি সম্ভব হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।