সৌদি আরবের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। সোমবার ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি দাবি করেছে যে, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে বেশ কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। হুতিদের লক্ষ্য ছিল ওই ঘাঁটির রাডার সিস্টেম, রানওয়ে, গোলাবারুদের গুদাম এবং বিমান রাখার হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা। এর আগে রোববার ওই এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল এবং সৌদি বাহিনীর ৩০০টির বেশি বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে হুতিরা। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জেদ্দায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে আঞ্চলিক বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি যুবরাজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প সরাসরি হামলায় রাজি না হলেও গোয়েন্দা তথ্য প্রদান এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের মিত্র হিসেবে পাশে থাকতে চাইলেও নতুন কোনো রণক্ষেত্রে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দ্বীপ—গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দখল করে নিয়েছে হুতিরা। বাব আল-মানদেব প্রণালি থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই দ্বীপগুলো থেকে সরকারি বাহিনী সরে যাওয়ার পর হুতিরা সেখানে নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর আগে তারা বন্দরনগরী মোখা এবং মাইয়ুন দ্বীপ দখল করেছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত অকেজো হয়ে পড়ায় লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা বাব আল-মানদেব প্রণালির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে, কারণ এই পথ দিয়েই এশিয়ার বাজারে সৌদি তেল সরবরাহ করা হয়।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী এবং হুতিদের মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। তাইজ প্রদেশের পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে সরকারি বাহিনী এবং মারিবে প্রদেশের তেল ও গ্যাসকেন্দ্র সংবলিত এলাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। এই অস্থিরতার প্রভাবে ওমানে নির্ধারিত ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। সৌদি আরব ইয়েমেন পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দেখালেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই একে 'মিথ্যা অজুহাত' বলে অভিহিত করেছেন। কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলো চরম মূল্য দিচ্ছে এবং তাদের ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতায় যেতে হতে পারে।
জ্বালানি বাজারেও এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে হুতিদের ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ৪ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মানবিক বিপর্যয় আরও ঘনীভূত হচ্ছে; আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মতে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের অনেকে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এক বাস্তুচ্যুত বৃদ্ধার আর্তনাদ উঠে এসেছে, যিনি যুদ্ধের কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন এবং মৌলিক চাহিদাও মেটাতে পারছেন না।




