পশ্চিম এশিয়ার চলমান অস্থিরতার মধ্যে সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে ওয়াশিংটন। মোট ৪৮টি যুদ্ধবিমান সরবরাহের এই চুক্তির আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ২৪.৩ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, চুক্তির আওতায় সৌদি আরব পাবে প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি কোম্পানির ৪৯টি ইঞ্জিন, প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য সামরিক উপকরণ।

পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সমরাস্ত্র বিক্রয় উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান নন-নেটো মিত্রের নিরাপত্তা জোরদার করবে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। চুক্তির মূল ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে টেক্সাসের লকহিড মার্টিন অ্যারোনটিকস এবং কানেটিকাটের প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি।

গত নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আতিথ্য দেওয়ার এক দিন আগে এই সম্ভাব্য চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, এফ-৩৫ পাওয়ার মাধ্যমে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে আকাশ থেকে আকাশ এবং আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দেশটির সামরিক বিমান বহর আরও শক্তিশালী হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক বাহিনী এবং নেটো সদস্যদের সঙ্গে সামরিক সমন্বয়ের সক্ষমতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এই চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের কারণে এফ-৩৫-এর অত্যাধুনিক রাডার ও নজরদারি প্রযুক্তি চীনের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি সামরিক স্থাপনায় চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে এফ-৩৫-এর তথ্য সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনে গভীর শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে হুয়াওয়ে ও জেডটিইর মতো চীনা কোম্পানির সরঞ্জাম সৌদির টেলিযোগাযোগ ও কিছু প্রতিরক্ষা স্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাবও চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের কারণে আটকে যায়। বাইডেন প্রশাসন ওই প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করে দেয়। সৌদি আরব অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র এবং মার্কিন অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু একই সময়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে রিয়াদ। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চীনের কাছ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে সৌদি আরব এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে চীনা সামরিক বাহিনী তাদের সহায়তা করছে।

এই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে কেবল ইসরায়েলেরই দখলে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি হলো এই অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা বজায় রাখা এবং মার্কিন কংগ্রেসও সেই নীতিকে সমর্থন করে। ফলে আরব দেশগুলোকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি বিক্রির আগে কংগ্রেসের কড়া নজরদারি থাকে। সৌদি আরবের সম্ভাব্য এফ-৩৫ কেনার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির বৃহত্তর কৌশলগত আলোচনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সহায়তার প্রতিশ্রুতিও আলাদা উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সরকারের অনুমোদন পাওয়া গেলেও এফ-৩৫ বিক্রির প্রক্রিয়া এখনই চূড়ান্ত হচ্ছে না। প্রস্তাবটি মার্কিন অস্ত্র বিক্রির নির্ধারিত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কংগ্রেসের বিচার-বিশ্লেষণের মুখোমুখি হবে। কংগ্রেসে বড় ধরনের আপত্তি না উঠলে তবেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার, লকহিড মার্টিন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে। এদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যেই এই চুক্তির খবর এল। বৃহস্পতিবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া একটি ড্রোন প্রতিহত করার পর ধ্বংসাবশেষ তাইফ প্রদেশে পড়ে এক ব্যক্তি নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। এর আগে মক্কার দিকে পাঠানো একটি ড্রোনও প্রতিহত করা হয়েছিল বলে জানায় সৌদি আরব, যদিও হুতিরা মক্কায় হামলার কথা অস্বীকার করেছে।