সৌদি আরবে চলচ্চিত্রের ইতিহাস এক দীর্ঘ নীরবতা এবং subsequent জাগরণের গল্প। এক সময় ইসলামি আকিদা, নৈতিকতা এবং ধর্মীয় শালীনতা রক্ষার দোহাই দিয়ে এই দেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও সিনেমা হলের ওপর কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছিল। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের মক্কা অবরোধ এবং 'সাহওয়া আন্দোলন'-এর পর দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নীতিতে ব্যাপক কঠোরতা আসে। চলচ্চিত্রকে তখন পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো। তবে ১৯৭০-এর দশকের আগে তেল কোম্পানিগুলোর নিজস্ব কমপ্লেক্স বা বিদেশি দূতাবাসে অনানুষ্ঠানিক সিনেমা প্রদর্শনী প্রচলিত ছিল।
এই পরিবর্তনের সূচনা হয় দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। ২০০৬ সালে নির্মিত 'কেফ আল-হাল?' ছিল সৌদি আরবের প্রথম বড় বাজেটের চলচ্চিত্র, যা তৎকালীন সমাজের দ্ব্যর্থতা এবং রক্ষণশীল বনাম উদারপন্থী সদস্যদের সংঘাতকে সামনে নিয়ে আসে। এরপর ২০১৮ সালে 'ভিশন ২০৩০' প্রকল্পের অংশ হিসেবে দীর্ঘ চার দশকের নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হয় এবং দেশজুড়ে অত্যাধুনিক সিনেমা হল চালু হয়। এর ফলে সৌদি আরবে এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্ম হয়। সমকালীন নির্মাতারা এখন ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশাসনের সঙ্গে সংঘাত না করে বরং নতুন দৃশ্যভাষার মাধ্যমে নিজেদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তৌফিক আল-জাইদির 'নোরা' (২০২৩) চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের পটভূমিতে নির্মিত এই সিনেমায় প্রতিকৃতি আঁকার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের আকুতি দেখানো হয়েছে, যা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে এক শৈল্পিক অবস্থান। একইভাবে মাহমুদ সাব্বাগের 'বারাকা মিটস বারাকা' (২০১৬) চলচ্চিত্রটি অস্কারের মনোনয়ন পেয়ে বিশ্বজুড়ে নজর কাড়ে। এই সিনেমাটি ডিজিটাল ইমেজ এবং নীতি পুলিশের দ্বন্দ্বর মধ্য দিয়ে আধুনিক সৌদি যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছে। এছাড়া অ্যানিমেশন নিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় আপত্তির বিপরীতে মালেক নেজের 'মাসামির' চলচ্চিত্রটি হাস্যরসের মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কার ও গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
সৌদি আরবের এই নতুন চলচ্চিত্র আন্দোলনের পেছনে কিছু তাত্ত্বিক ভিত্তি কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সামের আক্কাসের 'নজরতত্ত্ব', নেগার মোত্তাহেদের 'শালীনতার ব্যাকরণ' এবং অ্যান্টনি ক্লিকের 'অনুমতির সীমানা'। এই তত্ত্বগুলোর প্রয়োগে নির্মাতারা নগ্নতা বা অনৈতিক প্রদর্শন ছাড়াই নীরবতা এবং ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে উচ্চ নান্দনিক গল্প ফুটিয়ে তুলছেন। তারা পশ্চিমা বা প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কাছে আত্মসমর্পণ না করে নিজেদের নিজস্ব লোকজ রূপকথা, দৈনন্দিন জীবন এবং ধর্মীয় দ্বন্দ্বগুলোকে নিজেদের চোখে উপস্থাপন করছেন।
ধর্মতাত্ত্বিক স্তরেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় ডিজিটাল মাধ্যমকে 'স্রষ্টার সৃষ্টির অনুকরণ' বলে কঠোর মনে করা হলেও, বর্তমান ওলামা পরিষদ স্বীকার করেছেন যে ভিজ্যুয়াল মিডিয়া একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম। যদি চলচ্চিত্র অনৈতিকতা না ছড়িয়ে সামাজিক সচেতনতা ও শালীনতা বজায় রাখে, তবে তা ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী নয়। ফলে এখন সরাসরি নিষেধাজ্ঞার বদলে সেন্সরশিপের মাধ্যমে শালীনতার রূপরেখা নির্দিষ্ট করার পক্ষে মত দিচ্ছেন ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। সামগ্রিকভাবে, সৌদি আরবের এই সিনেমাটিক যাত্রা কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং নিজেদের ইতিহাস ও মনস্তত্ত্বকে একটি স্বায়ত্তশাসিত দৃশ্যভাষায় রূপান্তরের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস।




