ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম মেধাবী অভিনেতা কমল হাসান বলিউডে পা রেখেই ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিলেন। দর্শক এবং সমালোচক উভয়েরই প্রশংসা কুড়িয়ে তিনি খুব দ্রুত হিন্দি সিনেমার অন্যতম বড় তারকা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন। তবে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তিনি মুম্বাইয়ের চাকচিক্য এবং বড় বাজেটের হাতছানি উপেক্ষা করে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে ফিরে যান। আজ ৭ নভেম্বর, এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর বলিউড ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন এবং প্রস্থানের কারণগুলো পুনরায় আলোচনায় এসেছে।

১৯৭৪ সালে কে বালাচন্দরের ‘আইনা’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় যাত্রা শুরু করলেও, ১৯৮১ সালে ‘এক দুজে কে লিয়ে’ ছবির মাধ্যমে তিনি রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন। এরপর ‘সনম তেরি কসম’, ‘জারা সি জিন্দেগি’ এবং বিশেষ করে ‘সদমা’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও স্মরণীয়। ১৯৮৫ সালে রমেশ সিপ্পির ‘সাগর’ এবং অমিতাভ বচ্চনের সাথে ‘গেরাফতার’ ছবির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে হিন্দি সিনেমায় তাঁর অবস্থান অত্যন্ত শক্ত। কিন্তু ১৯৮৫ সালের পর তিনি দীর্ঘ বিরতিতে চলে যান এবং ১৯৯৭ সালে ‘চাচি ৪২০’ দিয়ে ফিরলেও আর নিয়মিত কাজ করেননি।

বলিউড ছাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কমল হাসান উল্লেখ করেছেন সেখানকার কাজের ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনা। ২০১৮ সালে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এবং ২০০৯ সালে ‘আইএএনএস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মুম্বাইয়ে একটি ছবি শেষ হতে দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যেত। অথচ একই সময়ে দক্ষিণ ভারতে তিনি প্রায় সাতটি ছবি শেষ করতে পারতেন। একজন অভিনেতার কর্মজীবন সংক্ষিপ্ত হওয়ায় সময়ের এই অপচয় তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এছাড়া তিনি নিজেকে হিন্দি সিনেমার ‘গরিব আত্মীয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, যেখানে অনেক তারকা একসাথে ছয়টি ছবিতে কাজ করে বিলাসিতায় জীবন কাটাতেন, সেখানে তাঁকে নিজের দৈনন্দিন কাজ এবং কাপড় ধোয়ার মতো বিষয়গুলো নিজেকেই সামলাতে হতো।

তবে শুধু সুযোগ-সুবিধার অভাবই নয়, কাজের নৈতিকতা এবং সৃজনশীলতার প্রশ্নও ছিল বড়। কমল হাসান বিশ্বাস করতেন একটি চরিত্রের পূর্ণতা দিতে হলে একটি ছবি শেষ করে তবেই অন্য কাজে যাওয়া উচিত। অন্যদিকে, বলিউডের কাজের ধরন ছিল ভিন্ন। এমনকি পরিচালক মনমোহন দেশাইয়ের সঙ্গে তাঁর সংঘাতের কথা জানা যায়, যেখানে চিত্রনাট্য দেখতে চাওয়ায় পরিচালক বিরক্ত হয়েছিলেন এবং অমিতাভ বচ্চনের উদাহরণ দিয়েছিলেন। কমল হাসান স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তিনি গল্পের গুরুত্বকে তারকার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন।

সবচেয়ে বিতর্কিত কারণটি ছিল মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতের সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কথিত সম্পর্ক। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সে সময় বলিউডে অপরাধজগতের প্রভাব ছিল ব্যাপক। হুমকির মুখে নতি স্বীকার করা বা এর বিরুদ্ধে লড়াই করে সময় নষ্ট করা—কোনোটিই তিনি বেছে নিতে চাননি। পাশাপাশি কালোটাকার বিষয়েও তিনি ও তাঁর ভাই কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন এবং এর আশ্রয় না নিয়েও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

দীর্ঘ সময় দূরে থাকলেও হিন্দি সিনেমার প্রতি তাঁর আকর্ষণ শেষ হয়নি। ‘হে রাম’, ‘অভয়’, ‘মুম্বাই এক্সপ্রেস’ এবং ‘বিশ্বরূপম’-এর মতো ছবিতে তিনি কাজ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নিজের শর্তে এবং প্রয়োজনীয় গল্প বলতে পারলে তিনি সবসময়ই হিন্দি সিনেমায় ফিরে আসতে আগ্রহী, কারণ হিন্দিভাষী দর্শকদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এখনো বিদ্যমান।