আজ ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৬ সালে মেক্সিকোতে জন্ম নেওয়া সালমা হায়েক ৬০ বছরে পা দিয়েছেন। মেক্সিকান টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ থেকে হলিউডের অন্যতম পরিচিত লাতিনা তারকা হয়ে ওঠার পথটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। ভাষা, পরিচয়, বয়স, উচ্চতা—সব বাধা পেরিয়ে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। হলিউডের ক্ষমতাবানদের চাপ, যৌন হয়রানির অভিযোগ—সবকিছু অতিক্রম করে আজ তিনি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করছেন।

শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল সালমার। তবে পরিবারকে বিষয়টি জানাতে সংকোচ বোধ করতেন। মেক্সিকোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি; তখন কূটনীতিক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। ১৮ বছর বয়সে বাবাকে অভিনয়ের কথা বললে বাবা প্রথমে বাধা দেন। তিনি চেয়েছিলেন মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাক। কিন্তু সালমা অভিনয়ের ক্লাসে যোগ দেন এবং একাডেমিক পড়াশোনা থেকে সরে আসেন।

১৯৮৯ সালে মেক্সিকোর টেলিনোভেলা সিরিজ 'তেরেসা'তে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এরপর মেক্সিকান সিনেমা ও থিয়েটারে কাজ করেন। তবে থিয়েটারে তাঁর তীব্র মঞ্চভীতি ছিল—এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কখনো কখনো তাঁকে পার্কিং এলাকা থেকে টেনে মঞ্চে নিয়ে যেতে হতো।

১৯৯১ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান সালমা। উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজি শেখা ও হলিউডে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিন্তু তখন লাতিনা অভিনেত্রীদের জন্য প্রধান চরিত্র পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। তাঁর ভাষায়, অনেকেই তাঁর স্বপ্ন নিয়ে হাসাহাসি করতেন। তবুও তিনি সুযোগ খুঁজতে থাকেন। ১৯৯৫ সালে 'ডেসপেরাডো' সিনেমায় অ্যান্টোনিও বান্দেরাসের বিপরীতে অভিনয় করে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকের কাছে পরিচিত হন। এরপর 'ফ্রম ডাস্ক টিল ডন', 'ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট', 'ডগমা'—এসব সিনেমা তাঁকে আলোচিত করে। তিনি জানান, তাঁর চেহারাই দরজা খুলে দিয়েছিল, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন মানুষ তাঁর অভিনয়কেও গুরুত্ব দিক।

সালমা হায়েকের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক 'ফ্রিদা'। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলোর চরিত্রে অভিনয় করার পাশাপাশি তিনি প্রযোজনাও করেন। ছবিটি ছয়টি অস্কার মনোনয়ন পায়, আর সালমা পান সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন—এই বিভাগে মনোনীত প্রথম মেক্সিকান অভিনেত্রী হিসেবে। কিন্তু ছবি তৈরি করা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতা। প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিনের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে অভিযোগ তোলেন তিনি—যৌন হয়রানি, চাপ ও হুমকি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মূল চিত্রনাট্যে না থাকা একটি নগ্ন যৌন দৃশ্যে অভিনয় করতে বাধ্য করা হয়েছিল তাঁকে। সেই দৃশ্যের শুটিংয়ে তাঁর নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়, শরীর কাঁপছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কাঁদছিলেন। তবে ওয়াইনস্টিন অভিযোগের কিছু অংশ অস্বীকার করেছেন।

জীবনের আরেকটি কঠিন সময় এসেছিল ৩০ বছর বয়সে। ২০১৬ সালে ইআই ইউনিভার্সালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ৩০তম জন্মদিনে কেঁদেছিলেন—নিজেকে ব্যর্থ, একাকী ও পথহারা মনে হয়েছিল। ৫ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতা নিয়েও ভয় ছিল। তবে ৪০-এর দশকে এসে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, জীবন সবসময় নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না, এবং তা মেনে নেওয়ার মধ্যেই শান্তি আছে।

অভিনয়ের পাশাপাশি সালমা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যেখানে লাতিনা মানুষ ও নারীদের গল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। 'আগলি বেটি'সহ বেশ কিছু প্রকল্পের সঙ্গে প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ২০০২ সালে টেলিভিশন চলচ্চিত্র 'দ্য মালদোনাদো মিরাকল' পরিচালনা করে তিনি এমি পুরস্কার জেতেন। সেলিব্রিটি নেট ওর্থের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২০০ মিলিয়ন ডলার—অভিনয়, প্রযোজনা ও ব্যবসা থেকে।

সালমা হায়েকের ক্যারিয়ার শুধু সাফল্যের গল্প নয়; এটি পরিচয়, লিঙ্গ, ভাষা, বয়স ও ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। দীর্ঘ পথচলায় তাঁকে সবচেয়ে বেশি সাহস দিয়েছে 'না' শব্দটি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "আমার মনে হয়, 'না' শব্দটির চেয়ে আর কিছু বেশি অপছন্দ করি না।" সূত্র: এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি, সিবিএস নিউজ, ভ্যানিটি ফেয়ার।