ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্পিনার শেন ওয়ার্নকে শুধু সংখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, তবুও কিছু পরিসংখ্যান তার ব্যতিক্রমী প্রতিভার সাক্ষ্য দেয়। ২০২২ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে প্রয়াত হওয়া এই অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনারের জন্মদিন উপলক্ষে তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন নিয়ে আলোচনা করা যাক।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওয়ার্নের মোট উইকেট ১০০১টি, যা মুত্তিয়া মুরালিধরনের (১৩৪৭) পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০৭ সালে সিডনিতে নিজের শেষ টেস্টে তিনি এই চার অঙ্কের মাইলফলক স্পর্শ করেন। টেস্ট ক্রিকেটে তার শিকার ৭০৮টি উইকেট, এই সংস্করণেও মুরালিধরনের (৮০০) পরেই তার অবস্থান। উল্লেখ্য, ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বোলার যিনি ৬০০ ও ৭০০ উইকেটের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন।

টেস্টের এক ইনিংসে পাঁচ বা ততোধিক উইকেট নেওয়ার কীর্তি আছে তার ৩৭ বার। এখানেও তার চেয়ে এগিয়ে কেবল মুরালিধরন, যিনি ৬৭ বার এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন। এছাড়া ১০টি টেস্টে তিনি ম্যাচে দশ বা তার বেশি উইকেট লাভ করেছেন। ব্যাটসম্যানদের কট অ্যান্ড বোল্ড করে ফেরানোর দিক থেকে ২১ বার করে এই কীর্তি ড্যানিয়েল ভেট্টোরির সঙ্গে যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে। অনিল কুম্বলে ও মুরালিধরন (৩৫) এ তালিকার শীর্ষে।

টেস্টে তার মেডেন ওভারের সংখ্যা ১৭৬১, যা ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। মুরালিধরনের ১৭৯৪টি মেডেন ওভারের পরেই তার অবস্থান। ২০০২ সালে কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজের ১০০তম টেস্টে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন, যা শততম টেস্টে দ্বিতীয় সেরা ম্যাচ পরিসংখ্যান। এই রেকর্ডটি মুরালিধরনের দখলে, ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে তিনি ৯ উইকেট নিয়েছিলেন।

অ্যাশেজের ইতিহাসে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ ১৯৫ উইকেটের মালিক ওয়ার্ন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা গ্লেন ম্যাকগ্রার (১৫৭) চেয়ে তার সংগ্রহ ৩৮টি বেশি। নির্দিষ্ট একটি দলের বিপক্ষে এটি কোনো বোলারের সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ডও বটে। টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে তিনি ১৩৮ উইকেট শিকার করেছেন, যা ম্যাচের শেষ ইনিংসে সর্বোচ্চ। মুরালিধরন (১০৬) বা ম্যাকগ্রার (১০৩) কাছেও নেই এই সংখ্যা। ১৯৯৪ সালে ব্রিসবেনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭১ রানে ৮ উইকেট নেওয়া তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিংটি এসেছিল ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসেই।

ব্যাটসম্যানদের শূন্য রানে আউট করার দিক থেকে ১০২ বার করে ওয়ার্ন ও মুরালিধরন যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে। সবচেয়ে বেশি ১০৪ বার শূন্য রানে ফিরিয়েছেন ম্যাকগ্রা। ২০০৫ সালে এক পঞ্জিকাবর্ষে ৯৬ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি, যা এক বছরে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড। ২০০৬ সালে ৯০ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন মুরালিধরন। ওয়ার্ন ১৯৮১ সালে ডেনিস লিলির (৮৫) গড়া ২৪ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙেছিলেন। ২০০৫ সালের ঐতিহাসিক অ্যাশেজ সিরিজে ৫ ম্যাচে ৪০ উইকেট নেন, যা একটি অ্যাশেজ সিরিজে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ১৯৫৬ সালে ৪৯ উইকেট নিয়ে শীর্ষে জিম লেকার।

২০০ উইকেটের মাইলফলকে পৌঁছাতে ওয়ার্ন সময় নিয়েছিলেন মাত্র ১৪৪০ দিন, যা দ্রুততম। ১৯৯২ সালের ২ জানুয়ারি অভিষেকের পর ১৯৯৫ সালের ১১ ডিসেম্বরই এই কীর্তি গড়েছিলেন তিনি। দ্রুততম সময়ে ৩০০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডও তার — ১৯৯৮ সালের ৫ জানুয়ারি এই মাইলফলকে পৌঁছাতে তার সময় লেগেছিল ২১৯৬ দিন। ২৮ বছর ১১৪ দিন বয়সে ৩০০ উইকেট স্পর্শ করে তিনি ৩০ জনের তালিকায় দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ। সর্বকনিষ্ঠ ভারতের কপিল দেব, যিনি ২৮তম জন্মদিনের পরদিনই এ কৃতিত্ব গড়েছিলেন।

ফিল্ডার হিসেবে টেস্টে ১২৫টি ক্যাচ নিয়েছেন ওয়ার্ন। ইয়ান বোথামের পর ইতিহাসের দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ৩০০ উইকেট ও ১০০ ক্যাচের জোড়া কীর্তি তার। বোথামের ১২০ ক্যাচ ও ৩৮৩ উইকেটের বিপরীতে ওয়ার্নের ১২৫ ক্যাচ ও ৭০৮ উইকেট। টেস্টে ১৭ বার ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন তিনি, ওয়াসিম আকরামের সঙ্গে যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে। জ্যাক কালিস (২৩) ও মুরালিধরনের (১৯) পরেই তাদের অবস্থান।

সেঞ্চুরি না করে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ৩১৫৪ রান করার রেকর্ডও তার। দুবার নব্বইয়ের ঘরে গিয়েও সেঞ্চুরির দেখা পাননি। ২০০১ সালে পার্থে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ড্যানিয়েল ভেট্টোরির বলে ৯৯ রানে আউট হন, আর ২০০৫ সালে ম্যানচেস্টারে সাইমন জোন্সের বলে ৯০ রানে ফেরান অ্যাশলি জাইলস। ওয়ানডেতে তার উইকেট ২৯৩টি, যা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে ব্রেট লি (৩৮০) ও গ্লেন ম্যাকগ্রার (৩৮১) পর তৃতীয় সর্বোচ্চ।

আট নম্বর বা তার নিচে ব্যাট করতে নেমে টেস্টে ৩৭৩টি বাউন্ডারি (৩৩৭ চার ও ৩৬ ছক্কা) মেরেছেন তিনি, যা টেল এন্ডার হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ড্যানিয়েল ভেট্টোরির ৪৫৪ বাউন্ডারির পরেই তার অবস্থান। টেস্টে ৩৪ বার ডাক মেরেছেন ওয়ার্ন, যা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ। ম্যাকগ্রা (৩৫), ক্রিস মার্টিন (৩৬) ও কোর্টনি ওয়ালশ (৪৩) তার উপরে। ২০০৪ সালে পরপর ৪ ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার অনন্য কীর্তিও তার। ১২ মাসের ডোপিং নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রত্যাবর্তন টেস্টেই প্রথম ইনিংসে ৫/১১৬ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫/৪৩ নেন, ক্যান্ডিতে পরের টেস্টে আবার ৫/৬৫ ও ৫/৯০।

১৯৯৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে লর্ডসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন। বিশ্বকাপ ফাইনালে যেকোনো স্পিনারের জন্য এটি সেরা বোলিং ফিগার। টুর্নামেন্টে ২০ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের জিওফ অ্যালটের সঙ্গে যৌথভাবে সেরা উইকেটশিকারিও ছিলেন। টেস্টে হ্যাটট্রিক করা ইতিহাসের তিন লেগ স্পিনারের একজন তিনি — ১৯৯৪ সালে মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। বাকি দুজন জিম ম্যাথুজ (দুই বার) ও বাংলাদেশের অলক কাপালি।