কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে শিশুদের অপহরণের এক আতঙ্কজনক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি জানা গেছে, শিশুদের প্রলুব্ধ করে অপহরণ করতে এখন তাদেরই খেলার সাথীদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অপহরণকারীরা সাধারণত অন্য শিশুদের টাকা বা নতুন পোশাকের লোভ দেখিয়ে কোনো শিশুকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়।

এমনই এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ১৯ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দু রহমান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার ছয় বছর বয়সী ছেলে খেলার মাঠে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে যায়। দুই দিন পর আব্দু রহমানের কাছে একটি ভিডিও পাঠানো হয়, যেখানে দেখা যায় তার সন্তানকে গলা পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে এবং শিশুটি বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। অপহরণকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে সাত লাখ টাকা দাবি করে। অসহায় বাবা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার এবং মসজিদের মাধ্যমে চাঁদা তুলে মোট ২ লাখ ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তার সন্তানকে উদ্ধার করেন। আব্দু রহমানের অভিযোগ, ঘটনার আগে ও পরে তিনি ক্যাম্প ইনচার্জ এবং উখিয়া থানা পুলিশের সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো কার্যকর সাড়া পাননি। উল্টো পুলিশ তার মতো একজন দরিদ্র ব্যক্তির পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে তিনি দাবি করেন।

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য এবং কিছু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শিশুদের অপহরণে অন্য শিশুদেরই ব্যবহার করা হচ্ছে। কুতুপালং ক্যাম্পের একটি ভিডিওতে এক আট-নয় বছর বয়সী কন্যাশিশু স্বীকার করেছে যে, তাকে ৫০০ টাকা এবং নতুন জামার লোভ দেখিয়ে একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। এছাড়া শিশুদের নির্মম নির্যাতনের ভিডিও অভিভাবকদের কাছে পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এই পরিস্থিতি নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সামাজিক নেতা বা 'মাঝি'দের মতে, পুলিশের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ এবং কার্যকর সমাধানের অভাবের কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ জানাতে ভয় পান। তবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBN)-এর ১৪ নম্বর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমীন এই অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, রোহিঙ্গারা অনেক সময় আন্তর্জাতিক সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নিজেদের ভিডিও তৈরি করে। এছাড়া অনলাইন জুয়া বা মাদক ব্যবসার পাওনা টাকা আদায়ের ঘটনাকেও তারা অপহরণ হিসেবে চালিয়ে দেয় বলে তিনি মনে করেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে, কিছু প্রকৃত অপহরণের ঘটনা ঘটে, তবে তা খুব সামান্য।

অন্যদিকে, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. সামছু-দ্দৌজা জানিয়েছেন, তারা এই পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত এবং এপিবিএন-এর উচ্চপর্যায়ের সাথে আলোচনা চলছে। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে টেকনাফে ৬২টি অপহরণ মামলা রেকর্ড হয়েছে এবং ১৩৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)-এর মুখপাত্র শারি নিজমান এক মেইল বার্তায় জানিয়েছেন, ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। ইউএনএইচসিআর একটি মানবিক সংস্থা হিসেবে কেবল আইনি সহায়তা এবং সুরক্ষা সেবায় শরণার্থীদের সাহায্য করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের সমস্যা পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করে। বর্তমানে শুধু শিশু নয়, উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় সাধারণ গ্রামবাসী এবং রোহিঙ্গা নাগরিক উভয়েই অপহরণ চক্রের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ছে, যা পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।