ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে এক জটিল সংকটের মুখে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দুই মেয়াদে দেশটির সরকারি ঋণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে একটি কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ফ্রান্সের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ১১৯ শতাংশ ঋণের দায়ে জর্জরিত। সরকারি হিসেবে দেখা গেছে, জুন মাস শেষে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩.৫৯৬ ট্রিলিয়ন ইউরোতে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর আগে এই ঋণ ছিল জিডিপির ৯৭.৯ শতাংশ।

প্রস্তাবিত ৫৪ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও আগামী বছর বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে ফরাসি সরকার। দেশটির বাজেট মন্ত্রী ডেভিড অ্যামিয়েল সতর্ক করে বলেছেন, জাতীয় ঋণ খুব শীঘ্রই জিডিপির ১২২ শতাংশে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়বে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, অর্থাৎ 'কার্পেটের নিচে ধুলো চাপালে চলবে না'। ফলে ব্যয় কমানোর এই সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করতে পার্লামেন্টে কঠিন লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

এই ঋণ সংকট নিরসনে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলেনশোঁ একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) কাছে থাকা ফরাসি সরকারি বন্ডগুলো বাতিল করার কথা বলেছেন, যাতে জনকল্যাণমূলক কাজে বিনিয়োগের জন্য অর্থ পাওয়া যায়। তার মতে, এই ঋণকে 'স্থায়ী ঋণে' রূপান্তর করলে তা কার্যকরভাবে বাতিলের সমান হবে। তবে ইসিবি প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ এই প্রস্তাবকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তির 'চরম লঙ্ঘন' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এমন পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে ঋণদাতার কাছ থেকে চড়া সুদ চাওয়া হতে পারে অথবা ঋণ দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, দক্ষিণপন্থী নেতা মারিন লে পেন সরকারি অর্থব্যবস্থা 'পরিষ্কার' করার জন্য সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

ফ্রান্সের এই ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ১৯৭৩ সালের পর এই দেশ একবারও বাজেটে ভারসাম্য আনতে পারেনি। ২০০৮ সালের পর থেকে ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৯০ শতাংশের উপরে থাকলেও নিম্ন সুদের হারের কারণে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে ব্যবসায়িক সহায়তা ও ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকারের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে ২০১৯ সালে ৯৮ শতাংশ থাকা ঋণ ২০২০ সালেই বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪ শতাংশে।

ঋণের এই বোঝা এখন সরাসরি বাজেটে প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে মোট বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ মেটাতে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালে ঋণের সুদের পরিমাণ ৯০ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যাবে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা (৬৩.৪ বিলিয়ন ইউরো) বা শিক্ষা খাতের (৬৫.৫ বিলিয়ন ইউরো) ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি।

ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর মধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। 'স্কোপ' (Scope) সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রান্সের দীর্ঘমেয়াদী রেটিং কমিয়ে দিয়েছে, যার কারণ হিসেবে উচ্চ ঘাটতি ও কাঠামোগত সংস্কারের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। তবে 'ফিচ রেটিংস' (Fitch Ratings) আগস্ট মাসে ফ্রান্সের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং 'A+' এবং স্থিতিশীল হিসেবে বজায় রেখেছে। তাদের মতে, ফ্রান্সের বৈচিত্র্যময় উচ্চ-আয়ের অর্থনীতি এবং শক্তিশালী ব্যাংকিং খাতের কারণে এই স্থিতিশীলতা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ফ্রান্সের এই বিশাল ঋণের মালিকানা বিভিন্ন দেশের ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং পেনশন ফান্ডের হাতে রয়েছে।