চলে গেলেন কিংবদন্তি অভিনেতা টিম কারি। 'দ্য রকি হরর পিকচার শো'-এর ড. ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার এবং 'হোম অ্যালোন ২: লস্ট ইন নিউ ইয়র্ক'-এর আত্মতুষ্ট কনসিয়ার্জ চরিত্রে দর্শকদের মনে গেঁথে থাকা এই অভিনেতা মঙ্গলবার রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘদিনের ম্যানেজার ও বন্ধু মার্শিয়া হুরউইটজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করা হয়নি। ২০১২ সালে স্ট্রোকের পর থেকে হুইলচেয়ারে জীবন কাটাচ্ছিলেন কারি।
মঞ্চ ও পর্দায় তার অসামান্য উপস্থিতি, অদ্ভুত সব খলনায়ক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। 'স্প্যামালট', 'মাই ফেবারিট ইয়ার' এবং 'আমাদেউস'-এর জন্য টনি পুরস্কারে তিনবার মনোনীত হয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৯৪ সালে এমি পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "মানুষের মনের অদ্ভুত সব কোণ এবং আচরণ নিয়ে অভিনয় করা আমার ভালো লাগে, কারণ সেগুলো অনেক বেশি মজার।"
১৯৭৩ সালে লন্ডনের রয়্যাল কোর্ট থিয়েটারে প্রথম মঞ্চস্থ হয় 'দ্য রকি হরর পিকচার শো'। সেখানে ট্রান্সিলভেনিয়ান ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন কারি। পরে ব্রডওয়েতেও এই প্রযোজনায় অভিনয় করেন। ১৯৭৫ সালে ব্যারি বস্টউইক, মিট লোফ ও সুজান সার্যান্ডনের সঙ্গে কাল্ট-ক্লাসিক চলচ্চিত্রে মুখ্য ভূমিকায় দেখা যায় তাকে। এলজিবিটিকিউ+ চরিত্রের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এই শো ছিল সময়ের অনেক এগিয়ে। 'দ্য টাইম ওয়ার্প' গান এবং 'ড্যামিট, জ্যানেট!' সংলাপ আজও পপ-সংস্কৃতির অঙ্গ। ব্রডওয়েতে দুবার পুনরায় মঞ্চস্থ হয় শোটি, সর্বশেষ ২০২৬ সালে লুক ইভান্স ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রে অভিনয় করেন। ইভান্স ইনস্টাগ্রামে লেখেন, "তিনি ছিলেন এক শক্তি, এক উজ্জ্বল শিখা, অসামান্য মুগ্ধতা আর সেই সমৃদ্ধ কণ্ঠস্বর। আমি আশা করি, যেখানেই তুমি থাকো, এই হাই-হিল পরে আরেকজন ফ্র্যাঙ্কের জীবনের সেরা সময় কাটানো দেখে তুমি খুশি হয়েছ।"
কারির ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার ছিল ব্রিটিশ উচ্চারণে, যদিও প্রথমে তিনি জার্মান ও আমেরিকান উচ্চারণ চেষ্টা করেছিলেন। বাসে এক ব্রিটিশ মহিলার সঙ্গে কথা বলে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলে ২০১৫ সালে এলএ ম্যাগাজিনকে জানান। বহু বছর তিনি 'রকি হরর' নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে গেছেন, কিন্তু পরে আবার প্রকল্পটি গ্রহণ করেন।
ব্রডওয়ে মঞ্চে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে টম স্টপার্ডের 'ট্র্যাভেস্টিজ' (১৯৭৫-৭৬), পিটার শ্যাফারের 'আমাদেউস'-এ মোজার্ট চরিত্রে অভিনয় (ইয়ান ম্যাককেলেনের সালিয়েরির বিপরীতে) এবং ২০০৫ সালে 'স্প্যামালট'-এ রাজা আর্থার চরিত্র। নিউ ইয়র্ক টাইমস তাকে 'স্থির হাসি'সহ 'অবিচল, গম্ভীর কণ্ঠের' রাজা আর্থার বলে বর্ণনা করেছিল। ২০০১ সালে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন থিয়েটারে 'আ ক্রিসমাস ক্যারল'-এ স্ক্রুজ চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।
টেলিভিশন ও সিনেমায় তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকার মধ্যে রয়েছে ১৯৯০ সালের মিনিসিরিজ 'ইট'-এ শিশুহত্যাকারী দানব চরিত্র, 'দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর'-এ মেডিকেল অফিসার এবং ১৯৯৩ সালের 'দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স'-এ দ্বিমুখী কার্ডিনাল রিচেলিউ চরিত্র। কিয়েফার সাদারল্যান্ড, চার্লি শিন ও ক্রিস ও'ডোনেলের সঙ্গে এই ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
১৯৮৫ সালের 'ক্লু' ছবিতে রহস্যময় অতীতের বাটলার ওয়াডসওয়ার্থ চরিত্রেও দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৯৫ সালে 'কঙ্গো'-তে ধনী সমাজসেবীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। ক্যারল বার্নেটের সঙ্গে 'অ্যানি' ছবিতে খলনায়ক চরিত্রে দেখা যায় তাকে। বার্নেট ইনস্টাগ্রামে লেখেন, "প্রিয় ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করার মতো দক্ষতা তার ছিল। তিনি আমার প্রিয় বন্ধু ছিলেন। তাকে চেনা আমার সৌভাগ্য।"
পরবর্তী বছরগুলোতে শিশুদের টিভি সিরিজে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও কাজ করেছেন কারি। 'স্টার ওয়ার্স: দ্য ক্লোন ওয়ার্স', 'দ্য ওয়াইল্ড থর্নবেরিস' এবং 'দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ জিমি নিউট্রন: বয় জিনিয়াস'-এর মতো জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড সিরিজে তার গভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। ২০২৪ সালে 'স্ট্রিম' ছবিতে হুইলচেয়ারে প্লেগ ডক্টর মুখোশ পরা চরিত্রে অভিনয় করেন, যা পরিচালক মাইকেল লেভির স্বপ্নপূরণ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত গোপনীয় ছিলেন কারি। কখনও বিয়ে করেননি, সন্তানও ছিল না। ২০২৫ সালে প্রকাশিত তার স্মৃতিকথা 'ভ্যাগাবন্ড'-এ তিনি লিখেছিলেন, "আমার চরিত্রগুলোর মধ্যে আমার প্রকৃতির কিছু অংশ থাকলেও আমি তাদের কেউ নই। দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ আমার আসল আমি আর অভিনয়ের চরিত্রের পার্থক্য বুঝতে না পেরে হতাশ হয়েছেন। এতে আমার খুব একটা দুঃখ হয়নি, তবে মাঝে মাঝে স্টকারদের ঠেকাতে হয়েছে।"
ইংল্যান্ডের চেশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন কারি। নৌবাহিনীর চ্যাপলিন ও স্কুল সেক্রেটারির সন্তান ছিলেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর মা কাজে যেতেন, তাই ছোট্ট টিম নিজেই নাস্তা বানাতে শিখে ফেলেছিলেন। এ থেকেই রান্নার প্রতি তার আজীবন ভালোবাসা গড়ে ওঠে। নতুন স্কুলে মানিয়ে নিতে হাস্যরসই তার অস্ত্র ছিল বলে জানিয়েছিলেন।
অভিনয়ের প্রতি তার ঝোঁক কৈশোরে তৈরি হয়। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নাটক নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে লন্ডনে গিয়ে ওয়েস্ট এন্ডের 'হেয়ার' নাটকে প্রথম কাজ পান। রয়্যাল শেক্সপিয়র কোম্পানি ও রয়্যাল কোর্ট থিয়েটারে কাজ করার সুযোগ পান, যেখান থেকে 'রকি হরর' ছবিতে যুক্ত হন।
স্মৃতিকথায় কারি লিখেছেন, তার জীবনের অভিজ্ঞতা অনুরণিত হতে পারে এমন ভক্তদের জন্য তিনি নিজের গল্প বলতে রাজি হয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, একজন কিশোর যদি তার ঘরে একা বই নিয়ে বসে থাকে, অথবা বাসে দীর্ঘ যাত্রায় থাকা কোনো তরুণী, কিংবা এখনও মাছনেট পরা সেই বয়স্ক ভক্ত — সবার কাছে তার গল্প পৌঁছাক, এটাই ছিল তার ইচ্ছা।



