তামাকজনিত রোগ এখনো বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। শুধু সরাসরি ধূমপানই নয়, অন্যের ধোঁয়া থেকে তৈরি পরোক্ষ ধূমপানও যে বিশাল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, তা তুলে ধরেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এই গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিশ্বে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাটি আনুমানিক ১৬ লাখ ৬০ হাজার বলে জানানো হয়েছে গবেষণায়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে ২৭০ কোটিরও বেশি মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে ৭৬ কোটি ৭০ লাখই শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের প্রায় ২৮ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শুধু মৃত্যুই নয়, বহু মানুষ অকাল অসুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতার শিকার হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের তথ্যভান্ডার পাবমেডে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা ও জনসংখ্যাভিত্তিক জরিপ পর্যালোচনা করে গবেষকেরা এই চিত্র পেয়েছেন। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার মানুষের সংখ্যা এবং এর ফলে সৃষ্ট রোগের বোঝা নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
পরোক্ষ ধূমপানের ফলে যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইসকেমিক হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। হৃদপেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে না পারলে এই রোগটি হয়। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রে ৫২ লাখ সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংক্রমণ অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
অধূমপায়ীরা মূলত দুই ধরনের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসেন। একটি হলো জ্বলন্ত তামাকজাত পণ্য থেকে সরাসরি বের হওয়া ধোঁয়া, অন্যটি ধূমপায়ীর নিশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া ধোঁয়া। গবেষণায় বলা হয়েছে, অধূমপায়ীরা সাধারণত প্রথম ধরনের ধোঁয়াই বেশি গ্রহণ করেন, যা কোনো ছাঁকনির মধ্য দিয়ে যায় না। ফলে ধূমপায়ী নিজে যে ধোঁয়া গ্রহণ করেন, তার তুলনায় এতে বিষাক্ত ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে।
১৯৯০ সালের পর বিশ্বে ধূমপায়ীর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বিশেষ করে নারীরা পরোক্ষ ধূমপানে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যে সব অঞ্চলে নারীদের মধ্যে ধূমপানের হার কম, সেখানেও তাঁরা অন্যের ধূমপানের কারণে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। গবেষকদের মতে, এত বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি সত্ত্বেও নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য পরোক্ষ ধূমপানকে এখনো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় না।
এ পরিস্থিতিতে জনসমাগমস্থল এবং ঘরের ভেতরে তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারগুলোর আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।




