যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় পরিবেশবিজ্ঞান ও ন্যাচারাল রিসোর্স জার্নালিজম নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন বাংলাদেশের পরিবেশ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোছাব্বের হোসেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি অলাভজনক নিউজরুম, বিশেষায়িত পরিবেশ ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি।

তিনি বলেন, শুধু সাধারণ রিপোর্টিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকলে আর চলবে না; একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা তৈরি করা জরুরি। কেউ পানি, নদী বা জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে বিশেষায়িত হতে পারেন, আবার কেউ জ্বালানি, বন, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য, কৃষি বা জলবায়ু অর্থনীতি নিয়েও কাজ করতে পারেন। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ, কারণ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবের অনেক শক্তিশালী গল্প রয়েছে। স্থানীয় এসব গল্পকে বিজ্ঞান, তথ্য-উপাত্ত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে আন্তর্জাতিক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব।

তিস্তা নদীর তীরে শৈশব কাটানো মোছাব্বের হোসেন ছোটবেলা থেকেই নদীভাঙনের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে মানুষের জমি-ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সাংবাদিকতায় এসে তিস্তা নিয়ে কাজ করতে গিয়েই পরিবেশবিষয়ক রিপোর্টিংয়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্ম নেয়। প্রথম আলোতে প্রায় এক দশক কাজ করার সময় তিনি উপলব্ধি করেন, পরিবেশের গল্প শুধু নদী, বন বা প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, অভিবাসন ও নীতিনির্ধারণও জড়িত।

যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে এসে তার দৃষ্টিভঙ্গি আরও প্রসারিত হয়েছে। তিনি দেখেছেন, সেখানে পরিবেশ সাংবাদিকতায় বিজ্ঞান, ডেটা, পাবলিক রেকর্ড, গবেষণা ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে একত্রে ব্যবহার করা হয়। এখন তিনি শুধু সমস্যাটি কী তা খুঁজে দেখেন না, কেন হচ্ছে, কারা দায়ী, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সম্ভাব্য সমাধান কী—এসব বিষয়েও অনুসন্ধান করেন।

বাংলাদেশে পরিবেশ সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশে অনেক ভালো পরিবেশ প্রতিবেদন হচ্ছে, তবে আরও গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন। শুধু বন্যা হয়েছে, নদী ভেঙেছে বা তাপমাত্রা বেড়েছে—এতটুকু বললে হবে না। কেন হচ্ছে, কোন নীতি কাজ করছে না, অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সমাধান কী হতে পারে—এসব প্রশ্নও করতে হবে। সাংবাদিকদের বিজ্ঞান বোঝা, ডেটা বিশ্লেষণ, পাবলিক ডকুমেন্ট ব্যবহার, গবেষণাপত্র পড়া ও অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কণ্ঠস্বরকে প্রতিবেদনের কেন্দ্রে আনতে হবে।

আন্তর্জাতিক চাকরি বা ফেলোশিপের জন্য প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন—বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিজ্ঞান বোঝার ক্ষমতা, ডেটা ও অনুসন্ধানী দক্ষতা, ইংরেজিতে যোগাযোগ ও পেশাগত নেটওয়ার্ক। এছাড়া কৌতূহলকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। একজন পরিবেশ সাংবাদিককে সব সময় প্রশ্ন করতে হবে—একটি নদী কেন শুকিয়ে যাচ্ছে, একটি এলাকায় কেন বারবার দাবানল হচ্ছে, একটি প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্য কে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী মানুষগুলো কেন অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে মোছাব্বের হোসেন বলেন, তিনি বিজ্ঞান, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং মানুষের গল্পকে আরও শক্তভাবে একসঙ্গে আনতে চান। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ ও সমাধানমুখী সাংবাদিকতায় আরও কাজ করতে চান। তিস্তার পাড়ে পরিবেশগত পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। এখন যুক্তরাষ্ট্রে এসে একই বৈশ্বিক সমস্যাকে অন্য একটি প্রেক্ষাপটে দেখছেন। এই দুই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এমন সাংবাদিকতা করতে চান, যা শুধু সমস্যা তুলে ধরবে না; বরং সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করবে, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশ্ন তুলবে এবং সম্ভাব্য সমাধানের দিকগুলোও সামনে আনবে।

প্রথম আলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং, সোর্স তৈরি, মানুষের গল্প শোনা ও জনস্বার্থের বিষয় অনুসন্ধানের দক্ষতা দিয়েছে। রয়টার্সে কাজ করার সময় তিনি শিখেছেন, একটি স্থানীয় ঘটনাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক করে উপস্থাপন করতে হয়। ইনসাইড ক্লাইমেট নিউজে কাজ করার সময় দলগত কাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন। মন্টানায় দাবানল, খনি, পানি ও অন্যান্য পরিবেশগত বিষয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে তিনি গভীরভাবে বুঝেছেন, একটি ভালো পরিবেশ প্রতিবেদনে বিজ্ঞান ও মানুষের গল্প—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ ও পেশাগত নেটওয়ার্ক তাকে শিখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা হলেও এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের জীবনেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।