পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে, যেখানে অসুস্থ এক মা তাঁর একমাত্র ছেলের সঙ্গে থাকার আকুতি জানালেও ছেলে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ৫৫ বছর বয়সী মুন্নি খাতুন তাঁর ৩২ বছর বয়সী ছেলে সাগর হোসেনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করেন যেন তিনি তাঁর সঙ্গে থাকতে পারেন। তবে সাগর হোসেন সাফ জানিয়ে দেন, মায়ের ভরণপোষণের যাবতীয় খরচ তিনি বহন করবেন, কিন্তু তাঁকে নিজের সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, মাকে সঙ্গে রাখলে তাঁর আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই শুনানির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউএনও সেলিম আহমেদ জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে মুন্নি খাতুন ও তাঁর মামার পক্ষ থেকে একটি লিখিত আবেদন জমা পড়ে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, ছেলে তাঁকে বাড়িতে রাখেন না এবং ভরণপোষণও দেন না। অসুস্থ মুন্নি খাতুনের একমাত্র চাওয়া ছিল জীবনের শেষ দিনগুলো ছেলের পাশে কাটিয়ে দেওয়া। শুনানির সময় ইউএনও সাগর হোসেনকে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি মা-বাবার ভরণপোষণ সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও সাগর নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

ইউএনও সেলিম আহমেদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিরোধটি আর্থিক নয় বরং সম্পূর্ণ মানসিক। মুন্নি খাতুন আর্থিক সুবিধার চেয়ে ছেলের সান্নিধ্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, অন্যদিকে সাগর খরচ দিতে রাজি হয়েও মাকে গ্রহণ করতে চাইছেন না। উল্লেখ্য, মুন্নি খাতুন বিভিন্ন সরকারি ভাতা পান এবং তাঁর নিজস্ব নামে প্রায় ১০ লাখ টাকার জমি রয়েছে, ফলে এখানে আর্থিক অনটনের কোনো প্রভাব নেই। শুনানি শেষে সাগর তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেও একসঙ্গে থাকার বিষয়ে কোনো সম্মতি দেননি।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এই তিক্ততার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি। সাগরের বিয়ের পর থেকে তাঁর স্ত্রী এবং মায়ের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। পরবর্তীতে সাগরের বোনও মায়ের পক্ষ নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান জানান, পারিবারিক বিরোধের এক পর্যায়ে মুন্নি খাতুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন, যার ফলে সাগরকে পুলিশি মারধরের শিকার হতে হয়। এই ঘটনাটি সাগরের মনে মায়ের প্রতি গভীর অভিমান তৈরি করেছে বলে মনে করা হয়।

সাগর হোসেন বর্তমানে নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত। তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘ আগে মারা গেছেন এবং বোন বিবাহিত। বর্তমানে মুন্নি খাতুন তাঁর মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছেন। চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাগরকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন এবং আশা করছেন যে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হবে। আপাতত সাগরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কিছুদিন পর পুনরায় শুনানি ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এই পারিবারিক বিরোধ মেটানোর পরিকল্পনা করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ।