উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১৯৩টি পানিতে ডোবার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই দুর্ঘটনাগুলোতে ৭২টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। তবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ তথ্য এখনো এতে যুক্ত করা হয়নি, যা যুক্ত হলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হাতিয়া উপজেলায়, যেখানে ৫৬টি ঘটনায় ৪৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জে ৩৮টি ঘটনায় ১৪ জন, কবিরহাটে ২৩টি ঘটনায় ১১ জন এবং সেনবাগে ৩৭টি ঘটনায় ৪টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে চাটখিলে ৩১টি, বেগমগঞ্জে ১৮টি, সুবর্ণচরে ৮টি এবং সোনাইমুড়ীতে ১টি পানিতে ডোবার ঘটনা ঘটলেও সেখানে কোনো প্রাণহানি রেকর্ড করা হয়নি।

সম্প্রতি নোয়াখালী সদর উপজেলার নেয়াজপুর ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামে এমনই এক করুণ ঘটনা ঘটেছে। জেলা আদালতের আইনজীবী আবদুর রহিমের আড়াই বছর বয়সী পুত্র ইলহাম নূর ফালাক বাড়ির পুকুরে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। জুমার নামাজে থাকা বাবা এবং রান্নার কাজে ব্যস্ত মায়ের নজরের বাইরে মাত্র ১০-১৫ মিনিটের ব্যবধানে শিশুটি পুকুরঘাটে চলে যায়। পরিবারের সদস্যরা সেখানে জুতা পড়ে থাকতে দেখে তল্লাশি চালান এবং অচেতন অবস্থায় ইলহামকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই পরিস্থিতি নিয়ে জেলা সিভিল সার্জন মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালালেও এটি কেবল তাদের একক দায়িত্ব নয়। স্থানীয় সরকার, যুব উন্নয়ন এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, বাবা কর্মক্ষেত্রে গেলে অনেক মা গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত থাকেন, ফলে শিশুরা হাঁটাহাঁটি করার সময় পানিতে ডুবে যায়। এই ঝুঁকি কমাতে ডে-কেয়ার সেন্টার বা নির্ভরযোগ্য কারও তত্ত্বাবধানে শিশুদের রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহনাজ আক্তার বলেন, নোয়াখালীর ভৌগোলিক গঠন নদী ও জলাশয়বেষ্টিত এবং প্রতিটি বাড়ির সামনেই উন্মুক্ত পুকুর থাকায় এই প্রবণতা বেশি। এই 'নীরব মহামারি' রুখতে অভিভাবকদের সতর্ক করার পাশাপাশি শিশুদের দ্রুত সাঁতার শেখানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।