নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ। নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালে তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে জানা গেছে, তাঁর শরীরে মোট ছয়টি গুলির আঘাত ছিল। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, লুৎফুজ্জামানের বুকে তিনটি গুলির ক্ষত ছিল, যার মধ্যে দুটি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি পিঠে আটকে ছিল। এছাড়া কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে একটি গুলি মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। বাকি দুটি গুলির একটি মাথার উপরিভাগে এবং অন্যটি ডান কাঁধের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। ক্ষতের ধরন দেখে চিকিৎসকের প্রাথমিক ধারণা, সামনে থেকে পিস্তল ব্যবহার করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে তেলনজিয়া এলাকায় এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আলিফ একটি চায়ের দোকানে চা পান করে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। তবে দোকানে নিজের মুঠোফোন ফেলে যাওয়ায় তিনি পুনরায় ফিরে আসেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দুই যুবক সেখানে এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চায় এবং মুহূর্তের মধ্যে আলিফকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়ে। স্থানীয়দের ভিড় জমতে শুরু করলে হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ পিস্তলের গুলির খোসা এবং একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করেছে। পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম এই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছেন এবং অপরাধীদের ধরতে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার রাতে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা দুর্গাপুর থানায় সাত থেকে আটজন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। লুৎফুজ্জামানের মরদেহ কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান নিশ্চিত করেছেন যে, আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

নিহত লুৎফুজ্জামান বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে ভিডিও ও লেখা প্রকাশ করতেন। কলমাকান্দার সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে আলিফ তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকার্ত স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা জানিয়েছেন, তাঁদের দুটি ছোট সন্তান রয়েছে এবং স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।

উল্লেখ্য, সাংবাদিকতার কারণে লুৎফুজ্জামানের অনেক শত্রু ছিল বলে দাবি করেছেন তাঁর বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকির। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও তারা বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।