চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ বিরতির পর পরিচালক হোমি আদাজানিয়া ফিরেছেন ‘ককটেল ২’ নিয়ে। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘ককটেল’ ছিল সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক ড্রামা, যেখানে অভিনয় করেছিলেন সাইফ আলী খান, দীপিকা পাড়ুকোন ও ডায়না পেন্টি। নতুন ছবিটি সরাসরি আগের ধারাবাহিকতা নয়; বরং একই ধরনের আবেগ ও সম্পর্কের জটিলতাকে নতুন প্রজন্মের চোখে উপস্থাপনের চেষ্টা। প্রথম ছবির ‘ইউ/এ’ সনদের বদলে এবার সরাসরি ‘এ’ সনদ পেয়েছে, কারণ গল্পে প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়বস্তু ও সম্পর্কের জটিলতা আরও তীব্র।

গল্পের কেন্দ্রে দীর্ঘদিনের যুগল কুনাল (শহীদ কাপুর) ও দিয়া (রাশমিকা মান্দানা)। প্রায় এক দশক ধরে একসঙ্গে থাকার পরও তাদের সম্পর্ক বিয়ের সামাজিক চাপে ভেঙে পড়েনি, এমনকি করোনাকালের দূরত্বও তা পারেনি। অথচ কুনালের একটি নিছক ঠাট্টা দিয়ার মনে সন্দেহের বীজ বুনে দেয়—সে বলে, যদি কখনো প্রতারণা করে, দিয়া তা বুঝতে পারবে না। এই সন্দেহ দূর করতে দিয়া তার পুরোনো বন্ধু অ্যালি (কৃতি শ্যানন)কে কুনালের সামনে হাজির করে; উদ্দেশ্য প্রেমিকের বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করা। সিসিলির ছুটিতে গিয়ে অ্যালি প্রথমে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে কুনালের প্রতি সত্যিই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এরপর সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে এবং কুনাল একপর্যায়ে ক্ষোভে জানায় যে, দুজনে মিলে তার জীবনকে তামাশায় পরিণত করেছে।

জুন মাসে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর ছবিটি মোটামুটি ব্যবসা করেছিল, কিন্তু সমালোচকরা একে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছিলেন। বেশির ভাগেরই রায় ছিল এটি অত্যন্ত দুর্বল। দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া লিখেছে, ছবিটি আধুনিক প্রেমের গল্প হতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত পুরুষতন্ত্রের রোমান্টিক কল্পনার পুরোনো পাত্রে কেবল নতুন নামকরণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমটির মতে, ছবিতে গ্ল্যামার, তারকা ও বিদেশি লোকেশন বিদ্যমান, তবু প্রেমের সেই স্বাদ, রস ও জীবনের স্পন্দন অনুপস্থিত। এটি রোমান্টিক কমেডির বদলে কোনো বাস্তবতা-ভিত্তিক দীর্ঘ অনুষ্ঠানের সংস্করণ বলেই অনুভূত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিয়ার চরিত্র, যাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে দর্শকের কাছে তার আচরণ প্রায় অসহ্য লাগে; পাশাপাশি পুরুষ দর্শককে কুনালের অবস্থানে বসে নিজেকে ‘অত্যাচারিত’ ও ‘মহান’ হিসেবে কল্পনা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

ভারতীয় একটি গণমাধ্যম ছবিটিকে ২.৫ তারকা দিয়ে উল্লেখ করেছে, এর মূল সমস্যা গল্পের ভিত্তি। দিয়ার সন্দেহ দূর করতে সে তার হোস্টেলসঙ্গী অ্যালিকে কুনালকে প্রলুব্ধ করার দায়িত্ব দেয়—এই সিদ্ধান্তই বিশ্বাসযোগ্য নয়। মজার পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টায় সম্পর্কের জটিলতাকে নিছক রসিকতায় পরিণত করা হয়েছে। ছবির অনেক দৃশ্যে আকর্ষণীয় মোড়কে মোড়ানো পুরুষতান্ত্রিকতা স্পষ্ট; যেমন এক রাতে অ্যালি অ্যাপার্টমেন্টে পোশাক ছাড়াই ঘুরে বেড়ায় কুনালকে উত্তেজিত করতে, আবার দিয়া উত্তেজিত হয়ে অ্যালিকে ফোন করে জানতে চায় কুনাল তার পরীক্ষায় ধরা পড়েছে কিনা—যেন নিজের সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর কথা নয়, অন্য কারও জীবনের রসালো গল্প শুনছে।

তবে লোকেশনের প্রশংসা করেছেন প্রায় সব সমালোচক। এনডিটিভি লিখেছে, ছবিটি দেখতে সুন্দর; বিশেষ করে সিসিলির দৃশ্যগুলো অসাধারণ। রং, পোশাক ও চিত্রগ্রহণ—সব মিলিয়ে দৃশ্যগত দিকটি আকর্ষণীয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে আবেগের জায়গাটি ফাঁকা। চরিত্রগুলোর মধ্যে ভালোবাসা, ঈর্ষা ও আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা পর্দা পেরিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছায় না। ফলে ‘ককটেল ২’ হয়ে ওঠে এমন এক প্রাণবন্ত নৃত্যশিল্পীর সঙ্গে তুলনীয়, যার পায়ে এখনও ছন্দ বিদ্যমান, কিন্তু মস্তিষ্কে যেন পূর্বরাত্রির তীব্র হ্যাংওভার। অভিনয়ে শহীদ কাপুর, রাশমিকা মান্দানা ও কৃতি শ্যাননের প্রশংসা করে তিন তারকা দেওয়া হয়েছে।

দ্য হিন্দুও ২.৫ তারকা দিয়ে শিরোনাম দিয়েছে ‘রঙিন আয়োজন, কিন্তু স্বাদহীন প্রেমের গল্প’। তাদের মতে, পরিচালক ফিরেছেন কিন্তু আগের ছবির আবেগ ও তীক্ষ্ণতার বদলে পরিবেশন করেছেন একটি শীতল মকটেলের মতো—দৃশ্যত উজ্জ্বল, কিন্তু স্বাদে প্রায় শূন্য। ছবিটিতে নারীর কণ্ঠ চাপা পড়ে গেছে এবং কুনালকে প্রায় নিষ্পাপ, বিশ্বস্ত ও আদর্শ প্রেমিক হিসেবে হাজির করা হয়েছে। প্রেম, নিরাপত্তা, অভ্যাস, বিয়ে ও বিশ্বস্ততার মতো বিষয় সামনে এলেও সেগুলো দর্শকের মনে তেমন দাগ কাটে না।

প্রাপ্তবয়স্ক সনদ বিতর্কের মধ্যেই ছবিটি ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করে। অথচ বক্স অফিস ও সমালোচকদের কাছে ‘ব্যর্থ’ এই ছবিই গত সপ্তাহে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়ার পর চমকে দিয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির বৈশ্বিক অ-ইংরেজি শীর্ষ ১০ সিনেমার তালিকায় এটি রয়েছে চতুর্থ স্থানে, আর বাংলাদেশে সরাসরি শীর্ষে পৌঁছে গেছে। সাধারণ দর্শক যে সমালোচকদের মতামতকে গুরুত্ব দেন না, তারই প্রমাণ এটি।

বাংলাদেশে এর জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করতে পারে। প্রথমত, আগের ‘ককটেল’-এর প্রভাব। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার উপস্থিতি; দেশে তিনি বরাবরই জনপ্রিয়, আর এই ছবিতে ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’র পরিচিত ইমেজ ছেড়ে ভিন্ন রূপে হাজির হয়েছেন। তৃতীয়ত, আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা তরুণ দর্শকদের আকর্ষণ করতে পারে। তবে সবাই যে খুব পছন্দ করেছেন, তা নয়। অনেকে দেখার পর বিরক্তি ও হতাশা প্রকাশ করেছেন; এই ‘নেতিবাচক’ প্রচারও অনেককে ছবিটি দেখতে উৎসাহিত করেছে। সম্প্রতি অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘ভূত বাংলা’ও একইভাবে বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের টপচার্টে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিল—যা প্রমাণ করে, প্রেক্ষাগৃহে ব্যর্থ হলেও ওটিটিতে কিছু ছবি এখানে নতুন জীবন পায়।