২০২৬ সালের শুরুর দিকে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ব্রিটিশ সিরিজ ‘রান অ্যাওয়ে’ বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক হরলান কোবেনের ২০১৯ সালের একই নামের উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই আট পর্বের সিরিজটি কেবল রহস্যময় কাহিনী নয়, বরং একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও গোপন সত্যের গল্প বলে। ড্যানিয়েল ব্রকেলহার্স্ট, টম ফ্যারেলি এবং আমান্ডা ডিউকের চিত্রনাট্যে এই সিরিজে হরলান কোবেন নিজেও যুক্ত ছিলেন। পরিচালনা করেছেন নিমের রাশেদ ও ইশার সাহোতা।

গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাইমন গ্রিন, যার জীবন আপাতদৃষ্টিতে ছিল অত্যন্ত সুখী। স্ত্রী ইনগ্রিড এবং তিন সন্তান নিয়ে তাঁর সাজানো সংসার। তবে বড় মেয়ে পেইজ গ্রিনের নিখোঁজ হওয়ার পর সেই সুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার সত্যগুলো একে একে সামনে আসতে শুরু করে। মাদকাসক্ত পেইজকে খুঁজতে গিয়ে সাইমন এক রহস্যময় জগতের মুখোমুখি হন। একটি শহরের পার্কে মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার পর এক ব্যক্তির সঙ্গে তর্কের জেরে খুনের ঘটনা ঘটে, যা সাইমনের জীবনকে আরও জটিল করে তোলে। একদিকে মেয়েকে খোঁজার তাড়না, অন্যদিকে খুনের দায়ে পুলিশের সন্দেহে পড়া—এই দ্বন্দ্বে সাইমনকে লড়াই করতে হয় নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে। এরই মাঝে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা এলেনা রেভেনসক্রফটের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যার নিজস্ব তদন্তের সঙ্গে সাইমনের অনুসন্ধান মিলেমিশে এক বড় রহস্যের জন্ম দেয়।

অভিনয়ের দিক থেকে জেমস নেসবিট সাইমন গ্রিনের চরিত্রে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। একজন উদ্বিগ্ন ও বিপর্যস্ত বাবার অসহায়ত্ব এবং অপরাধবোধ তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর মতো সমালোচকদের নজর কেড়েছে। মিনি ড্রাইভার ইনগ্রিড গ্রিনের চরিত্রে এবং রুথ জোন্স গোয়েন্দা এলেনার চরিত্রে অভিনয় করে গল্পে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। এছাড়াও আলফ্রেড এনক ও অ্যামি গ্লেডহিল গোয়েন্দা চরিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সিরিজের বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রায় প্রতিটি চরিত্রই কোনো না কোনো গোপন তথ্য লুকিয়ে রেখেছে, যা দর্শককে শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে সিরিজটি ৫ কোটি ৩ লাখ ভিউ অর্জন করেছে। মুক্তির পরপরই এটি নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক সেরা দশে জায়গা করে নেয় এবং টানা চার সপ্তাহ এই তালিকায় অবস্থান করে। বিশ্বের ৮৪টি দেশে এটি শীর্ষ তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা প্রমাণ করে এর আবেদন ছিল আন্তর্জাতিক। রটেন টমেটোজে ২৯টি পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটি ৮৩ শতাংশ সমালোচক স্কোর পেয়েছে। দ্রুতগতির প্লট এবং অপ্রত্যাশিত মোড়গুলো দর্শকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো বড় কোনো অপরাধের বদলে একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে রহস্যের সূচনা করা। একই সঙ্গে একাধিক রহস্যের সমান্তরাল পথচলা এবং সীমিত পর্বের কাঠামো দর্শককে দ্রুত গল্পের গভীরে নিয়ে গেছে। এছাড়া হরলান কোবেনের আগের কাজগুলোর বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তাও এখানে সহায়ক হয়েছে। মূলত এটি কেবল একটি খুনের রহস্য নয়, বরং একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে মানুষ কতটা সত্য গোপন করতে পারে এবং সেই সত্য প্রকাশের পর সম্পর্কের পরিণতি কী হয়, তা-ই ফুটিয়ে তুলেছে ‘রান অ্যাওয়ে’।