১৯৯৯ সালের ২১ মে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপা হওয়া উইলিয়াম রাদিচের ‘নজরুল কাব্যের নমুনা বিচার’ এখন অন্য আলো অনলাইনের পাঠকদের জন্য নতুনভাবে উপস্থাপন করা হলো। মশিউল আলমের অনুবাদে প্রস্তুত এই লেখাটি নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের গভীর পর্যালোচনা তুলে ধরে।
রাদিচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার খ্যাতিমান অনুবাদক ও বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপনা করেন। বাংলা সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর আগ্রহ বিস্তৃত। যদিও নজরুলের রচনা তাঁর কাছে আগে তেমন পরিচিত ছিল না, তবু প্রবন্ধে কবির শক্তি ও মৌলিকত্বের প্রশংসা করেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে জন্ম হলেও নজরুলের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল পূর্ববঙ্গের সঙ্গে। রাদিচের মতে, এর পেছনে কাজ করেছে তাঁর মুসলিম পরিচয়—যদিও তিনি কখনোই কেবল ‘মুসলমান কবি’ হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিলেন না—এবং কলকাতার অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক না থাকা। গ্রামীণ দরিদ্র শ্রেণির মানুষ হিসেবে কলকাতার সাহিত্যাঙ্গনে তিনি গুরুত্ব পাননি, যা রাদিচের মতো পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক পাঠকদের মধ্যেও একটি পক্ষপাত তৈরি করেছিল।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলকে প্রায়শই বিপরীত মেরুতে স্থাপন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ একবার মন্তব্য করেছিলেন যে নজরুল তরবারি দিয়ে দাড়ি কামানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে নজরুলই প্রথম রবীন্দ্রনাথকে বড় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং সঞ্চিতা সংকলনটি ভক্তিসহ তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন। রাদিচ মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের পরিশীলিত শহুরে পটভূমি ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ তাঁর ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছিল—এই মন্তব্য যথার্থ ছিল।
পাঠ শুরুর আগে রাদিচ ভেবেছিলেন নজরুল হয়তো অলংকারপূর্ণ, লোক-খ্যাপানো, এলোমেলো ও অপরিমার্জিত কবি হবেন। বাস্তবে এসব বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে থাকলেও কবির শক্তি ছিল বিরাট এবং মূল্যবোধগুলো ছিল সাহসিক, ইতিবাচক ও জীবনপ্রেরণাদায়ক। অসাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে নজরুল রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়িয়ে গেছেন বলে মত দেন রাদিচ, কারণ রবীন্দ্রনাথ সর্বজনীনতার দাবি করলেও তাঁর রচনায় মুসলিম ঐতিহ্যকে স্পষ্টভাবে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
মেজাজের দিক থেকে নজরুল কখনো উনিশ শতকের মাইকেল মধুসূদন দত্তের সঙ্গে তুলনীয়। উভয়েই বর্ণাঢ্য, ভবঘুরে ও বিদ্রোহী; মধুসূদন হিন্দু ও মুসলিম উভয় বিষয়ে লিখলেও তিনি ছিলেন নাগরিক ও অভিজাত, তাঁর আদর্শ ছিল মিলটন। অন্যদিকে নজরুল ছিলেন জনগণবাদী, ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাব স্বীকার করতেন এবং ষাট দশকের বিট প্রজন্মের কবিদের মতো মনে হতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কবিতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—এমন প্রতিটি স্থানে নজরুলের মতো কবিদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
রাজনীতিক না হয়েও নজরুলের অনেক বই ছিল নাশকতামূলক, যার জন্য তিনি একাধিকবার কারাবরণ ভোগ করেছেন। তবু তাঁর আবেদন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আবদ্ধ ছিল না; তা ছিল সর্বজনীন ও সাধারণ।
সাধারণত ‘বিদ্রোহী’কেই নজরুলের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কবিতা হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯২২ সালে অগ্নিবীণায় প্রকাশিত এই কবিতায় প্রাণোচ্ছল অলংকার, ছন্দোবদ্ধ উদ্দামতা, সামাজিক আদর্শবাদ ও রোমান্টিক আত্মবাদের মিশ্রণ রয়েছে যা কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব। এছাড়া সর্বহারা (১৯২৬)-এর ‘ছাত্রদলের গান’ কবিতায় মিছিলের মতো ছন্দ রয়েছে। সাম্যবাদী (১৯২৫)-তে সামাজিক বক্তব্য সবচেয়ে জোরালো; বইটির ইংরেজি অনুবাদ ‘কমিউনিজমে বিশ্বাসী একজন’ হলেও নজরুলের সাম্যবাদ ছিল অত্যন্ত ব্যাপক—‘সাম্য’ অর্থে সমতার ধারণা। এই কাব্যের পঙক্তিগুলো অগ্নিবীণার চেয়ে আরও সুবিন্যস্ত এবং সুর যুক্তিবাদী। ‘ঈশ্বর’ কবিতায় তিনি ঈশ্বর সম্পর্কে মানসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।
সিন্ধু হিন্দোল (১৯২৭)-এ অলংকার উপচে পড়েছে। প্রধান কবিতা ‘সিন্ধু’ তিন তরঙ্গে বিভক্ত, যেখানে সমুদ্রের শক্তি ও অস্থিরতার প্রতি কবির আকর্ষণ স্পষ্ট। এই কাব্যের ‘দারিদ্র্য’ কবিতায় নজরুল বলেছেন দারিদ্র্য তাঁকে যিশুর মতো মহান করেছে। বসন্তের সকালে কবির আনন্দ ও ক্ষুধার্ত কন্যার সামনে তাঁর রোমান্টিক স্বপ্ন ভেঙে পড়ার বর্ণনা ভীষণ নাড়া দেয়। দারিদ্র্য ও সন্তান-মৃত্যুর যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল; মনে করা হয়, সন্তানের মৃত্যুশোকে তাঁর মানসিক বিপর্যয় ঘটে এবং জীবনের শেষ দুই দশক তিনি পঙ্গু ও অসহায় অবস্থায় কাটান।
শিশুদের জন্য রচিত বাংলা ছড়া-কবিতার অনেক শ্রেষ্ঠ রচনা নজরুলের হাতে। ঝিঙে ফুল (১৯২৬)-এর ‘প্রভাতী’ তেমনই একটি উদাহরণ। অনেক পাঠক বাগ্মী নজরুলের চেয়ে শান্ত, প্রেমি নজরুলকে বেশি পছন্দ করেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ‘ইনট্রোডিউসিং নজরুল ইসলাম’ (ঢাকা, ১৯৬৫) গ্রন্থে বলেছেন, সরল ও শান্ত কবির মধ্যে একটি ঐক্য রয়েছে যা উপেক্ষা করা উচিত নয়—তিনি পাশাপাশি দুই ধরনের কবিতাই লিখেছেন। হিংস্রতা বা আত্মসমর্পণের যেকোনো প্রসঙ্গেই তিনি সব সময় রোমান্টিক ছিলেন—যদিও কখনো কখনো তিনি শ্লেষপূর্ণ ও বিদ্রূপাত্মকও হয়েছেন।
চন্দ্রবিন্দু নামে নিষিদ্ধ ঘোষিত বইয়ে ‘সন্ধি’ নামে একটি বুদ্ধিদীপ্ত কবিতা রয়েছে, যেখানে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের জন্য দুই সম্প্রদায়ের রীতিনীতির অদলবদলের বর্ণনা আছে, যদিও শেষ পর্যন্ত তা টেকসই হয় না। এই কবিতার অনুবাদ কঠিন হওয়ায় রাদিচ দোলন-চাপা (১৯২৩) থেকে একটি প্রেমের কবিতার অনুবাদ উপস্থাপন করেছেন, যেখানে পরাজিত বিদ্রোহীর আত্মসমর্পণ ও প্রেমিকের গৌরব ফুটে উঠেছে।




