আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জন্মদিন। ১৯৩৫ সালের এই দিনে ঝিনাইদহের শৈলকুপার মনোহরপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। গত ২৯ জুন তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। ফলে এটিই তাঁর প্রয়াণের পর প্রথম জন্মদিন, যা একই সঙ্গে স্মৃতি ও শোকের দিন। ১৯৮৪ সালে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে এক অ্যানিমেশন কোর্সে কবি পূর্ণেন্দু পত্রী বলেছিলেন, 'একটি দেশের জন্য একজন মুস্তাফা মনোয়ারই যথেষ্ট।' এই উক্তিটি যেন তাঁর শিল্পজীবনের বহুমাত্রিকতারই স্বীকৃতি। চিত্রকলা, পাপেট, টেলিভিশন, নাটক, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় উৎসবের পরিকল্পনা—সবক্ষেত্রেই তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
শিল্পীর শিকড় ছিল গ্রামে। পৈতৃক গ্রামে নদী, বটগাছ, ফসলের মাঠ এবং দূরের আকাশ দেখতে পেতেন তিনি। সবুজ ধানের ওপর বাতাসের ঢেউ, পুকুরের পাখি, হরিয়াল, পানকৌড়ি—প্রকৃতির এসব দৃশ্য তাঁর চোখকে শৈশবেই শিল্পীর চোখে পরিণত করেছিল। পরে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে সেই ভূদৃশ্যের প্রতিধ্বনি পেয়েছেন। পিতা কবি গোলাম মোস্তফার সংসারে কবিতা, গান, গ্রামোফোন, ফটোগ্রাফি, বইয়ের অলংকরণ—সব মিলিয়ে ছিল এক অনানুষ্ঠানিক শিল্পবিদ্যালয়। আব্বাসউদ্দীনের মতো শিল্পীরা সেখানে আসতেন। তাই শিল্পকে তিনি কখনো একক শাখায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; শিল্প ছিল তাঁর কাছে জীবনযাপনেরই নাম।
ভাষা আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মুস্তাফা মনোয়ার প্রতিবাদী ছবি এঁকে শহরের দেওয়ালে সেঁটে দেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় এক মাস বন্দি রাখে। সেই কিশোরই পরে ভাষাশহীদদের স্মৃতির অন্যতম স্থাপনা শহীদ মিনারের দৃশ্যরূপ নির্মাণে যুক্ত হন। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য অনুযায়ী, শহীদ মিনারের 'মা' প্রতীকের পেছনে লাল বৃত্ত সংযোজনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ইমদাদ হোসেন ও মুস্তাফা মনোয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীরও স্মৃতিচারণায় বলেছেন, রাতে পেছন থেকে আলো পড়লে যেন বাংলাদেশের পতাকার লাল সূর্যের অনুভব হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ যখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয়, তখন সেই লাল সূর্যের নিচেই শেষশ্রদ্ধা ও রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়—এ যেন ইতিহাস নিজেই তৈরি করা এক প্রতীকী দৃশ্য।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগোও তাঁর সৃজনশীলতার অন্যতম উদাহরণ। স্বাধীন বাংলাদেশের বিটিভির ঐতিহাসিক লোগোর মূল নকশাকার ইমদাদ হোসেন, তবে কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার ও শিল্পনির্দেশক মহিউদ্দিন ফারুকেরও ভূমিকা ছিল। পরে রঙিন সম্প্রচারের যুগে প্রবেশ করলে পুরোনো লোগোটি নতুনভাবে অঙ্কন করেন মুস্তাফা মনোয়ার। সবুজ ফ্রেমের মধ্যে উদীয়মান লাল সূর্য—এই সরল দৃশ্যচিহ্ন কয়েক প্রজন্মের মানুষের শৈশব, সংবাদ, নাটক ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
টেলিভিশনকে তিনি কখনো নিছক সম্প্রচারযন্ত্র মনে করেননি। তাঁর প্রযোজনায় মুনীর চৌধুরীর অনুবাদে শেক্সপিয়রের 'দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু' অবলম্বনে 'মুখরা রমণী বশীকরণ' এবং রবীন্দ্রনাথের 'রক্তকরবী' বাংলাদেশের টিভি নাটকের ইতিহাসে স্মরণীয়। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণের 'নতুন কুঁড়ি' অনুষ্ঠানেরও তিনি অন্যতম রূপকার। ছোট স্টুডিওর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ত্রিমাত্রিকতার অনুভূতি সৃষ্টি করে তিনি দেখিয়েছেন—সৃষ্টিশীল মানুষের কাছে সীমাবদ্ধতা বাধা নয়, বরং নতুন ভাষা আবিষ্কারের উপলক্ষ। তাঁর নিজের ভাষায়, শিল্পের সীমিত গণ্ডি মানুষকে আরও সাহসী করে; বাঁধাই হয়ে ওঠে উত্তরণের পথ।
বাংলাদেশে আধুনিক পাপেটচর্চার কথা বললে মুস্তাফা মনোয়ারের নাম অনিবার্য। গ্রামবাংলার পুতুলনাচের স্মৃতি, চিত্রকলার নন্দন, সংগীত, নাটক, অভিনয় ও লোককথাকে তিনি এক জায়গায় এনে পাপেটকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক শিল্পমাধ্যমে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর পাপেটের চরিত্র 'পারুল', 'বাঘা', 'মেনি'—শুধু শিশুদের আনন্দই দেয়নি, মানুষের সঙ্গে শিল্পের সহজ সম্পর্কও গড়ে তুলেছে। শিক্ষা যদি আনন্দহীন হয়, শিশু তাকে গ্রহণ করে না—এই সত্যটি তিনি বহু আগেই বুঝেছিলেন। তাই তাঁর পাপেট ছিল শিল্প, বিনোদন ও আনন্দময় শিক্ষার মিলিত মাধ্যম।
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও তিনি শিল্পের ছোঁয়া দিয়েছেন। সাফ গেমসের জন্য তাঁর পরিকল্পিত হরিণশাবক 'মিশুক' এবং পরে জীবন্ত পাপেটধর্মী 'অদম্য' ক্রীড়া আয়োজনে উৎসব ও সাংস্কৃতিক পরিচয় যুক্ত করেছিল। জলরঙে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল; তেলরং ও গ্রাফিকসেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। গান শিখেছেন, ভালো গাইতেন; ফটোগ্রাফি করেছেন; নাটক নির্মাণ করেছেন; তরুণ শিল্পীদের শিক্ষা দিয়েছেন। কর্মজীবনে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও এফডিসির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সংযোগ নির্মাণের শিল্পী—চিত্রকলার সঙ্গে সংগীত, সংগীতের সঙ্গে নাটক, নাটকের সঙ্গে পাপেট, পাপেটের সঙ্গে শিক্ষা, টেলিভিশনের সঙ্গে দৃশ্যকলা এবং রাষ্ট্রীয় স্মৃতির সঙ্গে প্রতীক—কোনো দেওয়ালই তিনি তৈরি করেননি। আজ তাঁর জন্মদিনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে তাকালে তিনি আছেন, বিটিভির লাল-সবুজ দৃশ্যচিহ্ন মনে করলে তিনি আছেন, 'নতুন কুঁড়ি'র কথা মনে হলে তিনি আছেন, বাংলা পাপেটের কথা উঠলে তিনি আছেন। পূর্ণেন্দু পত্রীর সেই উক্তির সঙ্গে আজ যোগ করা যায়—একজন মুস্তাফা মনোয়ার যথেষ্ট ঠিকই, কিন্তু এমন একজন শিল্পীকে তৈরি করতে একটি দেশকে বহু যুগ অপেক্ষা করতে হয়। ভাষা আন্দোলনের কিশোর থেকে শহীদ মিনারের লাল সূর্য নির্মাতা—এই পথ ধরেই তাঁর শিল্পজীবনের রূপক: অন্ধকারের বিপরীতে আলো, পরাধীনতার বিপরীতে স্বাধীনতা, জড়তার বিপরীতে সৃজনশীল জাগরণ। সেই লাল সূর্য জ্বলতে থাকবে, আর আলোর ভেতরে থাকবেন তিনি।


