ক্রিকেট বিশ্বের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে যা সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে অমর হয়ে থাকে। তেমনই এক অবিস্মরণীয় কীর্তির তিন বছর পূর্ণ হলো। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের অপরাজিত ২০১ রানের সেই ইনিংসটি আজ এক কিংবদন্তি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া এই অস্ট্রেলীয় তারকার সেই লড়াই এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এক রূপকথার মতো।

ম্যাচটি যখন শুরু হয়েছিল, তখন অস্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। মাত্র ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে তারা প্রায় পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়েছিল। ইএসপিএনক্রিকইনফোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিচেল স্টার্ক আউট হয়ে ফেরার পর অস্ট্রেলিয়ার জয়ের সম্ভাবনা নেমে এসেছিল ০.৪৬ শতাংশে, যা কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। এমন এক দুঃসময়ে মাঠে নেমেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। তাঁর লক্ষ্য ছিল পরাজয়ের চিত্রটিকে বদলে দিয়ে এক নতুন ইতিহাস লেখা।

১২৮ বলে ২০১ রানের এই ইনিংসটি কেবল রান সংগ্রাহক হওয়ার গল্প নয়, বরং এটি ছিল এক অদম্য মানসিক শক্তির লড়াই। ইনিংসের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র ক্র্যাম্পের যন্ত্রণায় ম্যাক্সওয়েল প্রায় অচল হয়ে পড়েছিলেন। শরীর ভেঙে পড়ায় তিনি সিঙ্গেল রান নিতে পারছিলেন না, এমনকি হাঁটার ভঙ্গি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। ধারাভাষ্যকার ইয়ান স্মিথ তাঁর সেই হাঁটার তুলনা করেছিলেন চার্লি চ্যাপলিনের হাস্যকর কিন্তু বেদনাপূর্ণ অভিনয়ের সাথে। শারীরিক যন্ত্রণায় তিনি বেশ কয়েকবার মাঠের ঘাসের ওপর শুয়ে পড়েছিলেন, যা দেখে সতীর্থ অ্যাডাম জাম্পার মনে হয়েছিল যে হয়তো তিনি যেকোনো মুহূর্তে মাঠ ছাড়বেন। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি এক পায়ের ওপর ভর করে ব্যাটিং চালিয়ে যান এবং অসম্ভবকে সম্ভব করেন।

ম্যাক্সওয়েলের এই বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের সামনে আফগান বোলার মুজিব উর রেহমান এবং আজমতউল্লাহ ওমরজাইরা পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর শটগুলোর বৈচিত্র্য এবং সাহসিকতা দেখে অনেক বিশেষজ্ঞের মনে হয়েছিল যেন তিনি রজনীকান্তের সিনেমার কোনো সুপারহিরো। এই অবিশ্বাস্য যাত্রায় তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছিলেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, যিনি ৬৮ বলে ১২ রান করে ধৈর্যের সাথে ক্রিজে টিকে ছিলেন। কামিন্স এবং বীরেন্দর শেবাগের মতো ক্রিকেট ದಿગগজরা এই ইনিংসটিকে ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ইনিংস হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ক্রিকবাজের মতো জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ম্যাক্সওয়েলের এই লড়াইকে আলেকজান্ডার বা চেঙ্গিস খানের মতো বিশ্ববিখ্যাত যোদ্ধাদের সাহসিকতার সঙ্গে তুলনা করেছে। এটি কেবল একটি ম্যাচ জয় ছিল না, বরং মানুষের সামর্থ্যের চূড়ান্ত সীমানার এক পরীক্ষা। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাসের সেই সান্তিয়াগোর মতো, যিনি সমুদ্রের সাথে লড়াই করে জিতে ফিরেছিলেন, ম্যাক্সওয়েলও তেমনি পরাজয়ের মুখ থেকে অস্ট্রেলিয়াকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সাফল্যের কথা বলে অভিভূত হয়েছিলেন এবি ডি ভিলিয়ার্সের মতো তারকারাও। আজ তিন বছর পরও এই ইনিংসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু লড়াই করার মানসিকতা থাকলে সে কখনোই পরাজিত হয় না।