বিশ্বের মহাকাশ শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে ইউরোপের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে প্যারিসে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক মহাকাশ সম্মেলন। বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই সম্মেলনে প্রায় ১২০টি দেশের মহাকাশ গবেষক, নভোচারী, সরকারি কর্মকর্তা এবং শিল্প খাতের শীর্ষ নেতারা একত্রিত হয়েছেন। সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হলো মহাকাশ শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য ব্যবসায়িক চুক্তির পথ খোঁজা। এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁন উল্লেখ করেন যে, ইউরোপ এখন মহাকাশসহ সব ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের পথে হাঁটছে। তিনি একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর ইউরোপ গড়ার লক্ষ্যে অধিক বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের ওপর জোর দেন।

মূলত অত্যাবশ্যকীয় প্রযুক্তিগত সেবার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চান প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁন। বিশেষ করে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, নজরদারি এবং রকেট উৎক্ষেপণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসনের পর এই প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়। তখন দেখা গিয়েছিল, এলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট পরিষেবা কিয়েভের জন্য যেমন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল, তেমনি এটি একটি ঝুঁকি হিসেবেও সামনে এসেছিল। যুদ্ধের শুরুতে স্টারলিংকের অর্থায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল এবং জানা গিয়েছিল যে, ২০২২ সালে একটি রুশ নৌঘাঁটিতে হামলার ক্ষেত্রে স্টারলিংক ব্যবহারের অনুমতি দেননি মাস্ক। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন 'আইরিস-টু' (Iris2) নামক একটি নিজস্ব স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন তৈরির কাজ করছে, যা স্টারলিংকের বিকল্প হিসেবে ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপদ যোগাযোগ সুবিধা দেবে। তবে ২০৩০ সালের আগে এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও ইউরোপকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন স্যাটেলাইট কোম্পানি প্ল্যানেট ল্যাবস এবং ভ্যান্টোর সংঘাতপূর্ণ এলাকার ছবি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল, যাতে শত্রুরা যুক্তরাষ্ট্রের বা তার মিত্রদের আক্রমণ করতে না পারে। এই ঘটনা অনেক দেশকে নিজস্ব স্যাটেলাইট ইমেজিং সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দিয়েছে। স্যাটেলজিক-এর সিইও এমিলিয়ানো কার্গিয়েমান জানান, এই কারণে পর্তুগালের সাথে তাদের উচ্চ-রেজোলিউশন ইমেজিং স্যাটেলাইট সরবরাহের চুক্তি হয়েছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-এর মহাপরিচালক জোসেফ অ্যাশবাখারের মতে, স্যাটেলাইট এখন একটি অপরিহার্য অবকাঠামো, তাই এর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ গবেষণায় অনেক এগিয়ে রয়েছে। নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে চাঁদে মানব বসতি স্থাপনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, এলন মাস্কের স্পেসএক্স পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণের খরচ কমিয়ে এবং এর ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে বাণিজ্যিক বাজারে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ২০২৫ সালে আমাজন তাদের প্রথম ইন্টারনেট স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে এবং বিশ্বজুড়ে ব্রডব্যান্ড সেবা দিতে ৩,২০০টির বেশি স্যাটেলাইট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া জেফ বেজোস পরিচালনা করছেন ব্লু অরিজিন রকেট কোম্পানি। তবে ফরাসি সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, প্যারিসের এই সম্মেলনে স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিন অংশগ্রহণ করেনি। পলিটিকো-র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস মার্কিন কোম্পানিগুলোকে এই সম্মেলনে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করেছে, কারণ এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু নীতিকে সমর্থন করার ইঙ্গিত মিলতে পারে।

ইউরোপের রকেট শিল্পের প্রধান শক্তি হলো 'আরিয়ান' (Ariane) প্রোগ্রাম। এর মাধ্যমে গ্যালিলিও নেভিগেশন সিস্টেম, কোপারনিকাস আর্থ-অবজারভেশন এবং বিভিন্ন সামরিক ও বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়। আরিয়ান-৬৪ সংস্করণটি সম্প্রতি তিনটি মিশনে আমাজনের ১০০টি লিও স্যাটেলাইট কক্ষপথে স্থাপন করেছে। তবে আরিয়ানের কার্যক্রম অত্যন্ত জটিল। এর মূল অংশ ফ্রান্সে তৈরি হয় এবং উপরের অংশটি তৈরি হয় জার্মানিতে, যেখানে ইউরোপের শত শত সাবকন্ট্রাক্টর যুক্ত থাকে। এরপর পণ্যবাহী জাহাজে করে এই যন্ত্রাংশগুলো ফ্রেঞ্চ গায়ানার কুরু স্পেসপোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই রকেটগুলো পুনঃব্যবহারযোগ্য নয়, যার ফলে স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯-এর তুলনায় এর খরচ অনেক বেশি এবং উৎক্ষেপণের সংখ্যাও সীমিত।

ইউরোপীয় নেতারা এখন নিজস্ব উৎক্ষেপণ ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন যাতে তারা স্পেসএক্স-এর ওপর নির্ভরশীল না থাকে। মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ফ্যালকন রকেটের বদলে বড় স্টারশিপ রকেট আনা হবে, যা ভবিষ্যতে উৎক্ষেপণের সংকটের সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমিলিয়ানো কার্গিয়েমান মনে করেন, চীন যেমন নিজস্ব উৎক্ষেপণ ক্ষমতা রাখে, ইউরোপের কাছে তেমন সাশ্রয়ী ও দ্রুতগতির ব্যবস্থা নেই। তবে সম্প্রতি জার্মান স্টার্টআপ 'ইসার' নরওয়ে থেকে সফলভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে এক বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রধান জোসেফ অ্যাশবাখারের মতে, ইউরোপের উচিত নিজস্ব রকেট বা ক্রু ভেহিকলের মাধ্যমে নভোচারীদের নিম্ন কক্ষপথে এবং তার বাইরে পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করা।