মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা (MENA) অঞ্চলের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অত্যন্ত প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে, যেখানে একের পর এক 'ইউনিকর্ন' এবং উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের জন্ম হচ্ছে। তবে এই অগ্রগতির মাঝেও একটি বড় বৈষম্য প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে—পুঁজি বা ক্যাপিটাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তারা এখনো চরমভাবে পিছিয়ে আছেন।

টেক এক্সিলারেটর 'ওয়ামদা'র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এই অঞ্চলের স্টার্টআপগুলো ২৪২টি রাউন্ডের মাধ্যমে মোট ১.৭ বিলিয়ন ডলার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC) বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। তবে এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপগুলো পেয়েছে মাত্র ২.৫ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বিনিয়োগের মাত্র ০.১৪ শতাংশ। বিপরীতে, পুরুষ নেতৃত্বাধীন স্টার্টআপগুলো ২১৩টি চুক্তির মাধ্যমে ১.৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। এই বৈষম্য নতুন কিছু নয়; ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জিসিসি (GCC) অঞ্চলের মোট ইক্যুইটি লেনদেনের ৪ শতাংশের কম অংশ নারী বা মিশ্র-লিঙ্গ নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে।

মজার বিষয় হলো, এই বিনিয়োগের অভাব সত্ত্বেও ওই অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গোড্যাডি-র ২০২৫ সালের একটি বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মেনা অঞ্চলের ৫১ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিক নারী, যাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু আবুধিতেই ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ৩,০৫৮টি নতুন ব্যবসায়িক লাইসেন্স নারী ইমিরাত নাগরিকদের দেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগের এই বিশাল ব্যবধানের পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিনিয়োগকারী পর্যায়ে বৈচিত্র্যের অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউকে-ভিত্তিক ভিবে ফার্ম 'প্যাক্ট'-এর লিমিটেড পার্টনার লুসি চাউ জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগকারী নেটওয়ার্কগুলো এখনো পুরুষতান্ত্রিক, বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যায়ে। যেহেতু বিনিয়োগের সুযোগগুলো মূলত নেটওয়ার্কিং-এর মাধ্যমে আসে, তাই এখানে নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকা বড় বাধা। দুবাই-ভিত্তিক 'কি ক্যাপিটাল'-এর ম্যানেজিং পার্টনার বাসিল মোফতাহ-এর মতে, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উভয় স্তরেই ভিবে শিল্পে পুরুষদের আধিপত্য রয়েছে, যা অবচেতনভাবেই বিনিয়োগের ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে।

ফাউন্ডার্স ফোরাম গ্রুপের উপাত্ত অনুযায়ী, যেসব ভিবে ফার্মে অন্তত একজন নারী পার্টনার থাকেন, সেখানে নারী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা ২.৩ গুণ বেশি। আবার যেখানে ৩০ শতাংশ বা তার বেশি পার্টনার নারী, সেখানে পুরুষ নেতৃত্বাধীন ফার্মের তুলনায় ৪.৭ গুণ বেশি বিনিয়োগ নারী উদ্যোক্তাদের দেওয়া হয়। এছাড়া নারী অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টররা তাদের বিনিয়োগের প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের দেন, যেখানে পুরুষ ইনভেস্টরদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৩ শতাংশ।

মূলধনের এই ঘাটতি মেটাতে অনেক নারী উদ্যোক্তা 'বুটস্ট্র্যাপিং' বা নিজস্ব সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করছেন। মাস্টারকার্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫৬ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসার প্রাথমিক খরচ মেটাতে পাশাপাশি অন্য কোনো কাজ বা 'সাইড হাসেল' করছেন। এছাড়া তারা দুবাই এসএমই এবং আবুধাবির খলিফা ফান্ডের মতো সরকারি উদ্ভাবন অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগও শুরু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মেনা অঞ্চলের প্রথম নারী প্রতিরোধক স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম 'নাবতা হেলথ'-এর সিইও সোফি স্মিথ হতাশ হয়ে নিজেই '২০২২ ফিমেল অ্যাঞ্জেলস' নামক একটি উদ্যোগ শুরু করেন, যার লক্ষ্য নারী বিনিয়োগকারীদের চিহ্নিত করা এবং তাদের তালিকাভুক্ত করা। বর্তমানে তাদের মাধ্যমে প্রায় ৩৫০ জন সক্রিয় অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরের সাথে যোগাযোগ রাখা হয়। এছাড়া সৌদি আরবের 'উইমেন স্পার্ক' নারীদের প্রশিক্ষণ ও মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের পথ সহজ করার চেষ্টা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল প্রশিক্ষণ বা ছোট উদ্যোগ দিয়ে এই বিশাল ব্যবধান ঘুচানো সম্ভব নয়। লুসি চাউ-এর মতে, একে কেবল উদ্যোক্তার সমস্যা হিসেবে না দেখে 'মূলধন বরাদ্দকরণ সমস্যা' হিসেবে দেখা উচিত। তিনি মনে করেন, সরকারগুলোর উচিত নির্দিষ্টভাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সিড ফান্ড গঠন করা এবং ওয়েলথ ফান্ড ও ফ্যামিলি অফিসগুলোর উচিত তাদের বিনিয়োগের একটি অংশ নারী নেতৃত্বাধীন স্টার্টআপের জন্য বরাদ্দ রাখা। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়া জিসিসি দেশগুলোর জন্য এই মেধাবী নারী উদ্যোক্তাদের অবহেলা করা হবে একটি বড় ক্ষতি।