কুমিল্লা জেলাজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্ক এখন আর কেবল শহরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও এই অপরাধী চক্রগুলো তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে। বিশেষ করে মনোহরগঞ্জ উপজেলার পোমগাঁও ও জলিপুর এবং চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন গ্রামে কিশোরেরা দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্র হাতে মহড়া দিচ্ছে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, মনোহরগঞ্জে 'পিএক্স ১০' এবং চৌদ্দগ্রামে '১২০৭' নামে দুটি সক্রিয় কিশোর গ্যাং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। সম্প্রতি এই দুটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জেলা পুলিশ কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর অবস্থান নেয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার ১৮টি থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের সমন্বয়ে সাত দফার এক বিশেষ অভিযান চালানো হয়, যার ফলে মোট ২ হাজার ৬৪৭ জনকে আটক করা হয়েছে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে ৪ অক্টোবর রাতে কুমিল্লার তেলিকোনা এলাকা থেকে 'স্ম্যাশ স্কোয়াড' গ্যাংয়ের নেতা জিসান ও সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া চৌদ্দগ্রাম থেকে '১২০৭' গ্যাংয়ের প্রধান মো. তারেক হোসেন সৈকত ও মো. জাফর আহমদ এবং মনোহরগঞ্জের পোমগাঁও থেকে 'পিএক্স ১০' গ্যাংয়ের এক ১৭ বছর বয়সী কিশোর নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ওই কিশোরের চাপাতি হাতে মহড়া দেওয়ার ভিডিও টিকটকে ভাইরাল হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই কিশোরেরা কেবল অস্ত্রের মহড়া দেয় না, বরং মাদক সেবন এবং নারীদের উত্ত্যক্ত করার মতো অপরাধেও জড়িত। বিশেষ করে চৌদ্দগ্রামের নলিশ্বর ও কোমারডোগা এলাকার কিশোর গ্যাংগুলোর কার্যক্রম স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এছাড়া কুমিল্লার আলোচিত 'রতন গ্রুপ' বা 'আর স্কোয়াড'-এর প্রধান ইমরান হোসেন রতন এবং 'ক্রাইম সেটআপ' গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতা সাব্বির ও রবিউল ইসলাম নব্বীকেও ২ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২২ সালে শাহাদাত হোসেন হত্যায় আলোচিত রতন গ্রুপ এবং কোটবাড়িকেন্দ্রিক 'কেবিজি গ্রুপ'ের সদস্যদের বিরুদ্ধেও পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। উল্লেখ্য, অপ্রতিম হত্যার মূল হোতা সাইফুল ইসলাম তুহিনও একসময় এই কেবিজি গ্রুপের সদস্য ছিলেন।

পুলিশের তথ্যানুসারে, কুমিল্লা শহর ও এর আশপাশে বর্তমানে সিবিকে, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, রয়েল বেঙ্গল, বিগ ব্রাদার এবং কিং স্কোয়াডসহ প্রায় ২৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অদ্ভুত সব নাম রাখার কারণ জানতে চাওয়া হলে গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামসুল আলম শাহ জানান, ফেসবুক ও টিকটকে ভীতির সৃষ্টি করা এবং অন্য গ্রুপের সাথে নামের মিল না রাখার উদ্দেশ্যেই তারা এমন নাম বেছে নেয়।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, শহর বা গ্রাম নির্বিশেষে প্রতিটি থানা এলাকায় নিয়মিত এই অভিযান চলবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (কুমিল্লা শাখা)-র সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান মনে করেন, রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই এই গ্যাংগুলো এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তিনি পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।