দীর্ঘদিনের ক্যানসারের সাথে লড়াইয়ের পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর মুম্বাইয়ের নানাবতী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন প্রখ্যাত বলিউড অভিনেতা মুস্তাক খান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। ভারতীয় চলচ্চিত্রকর্মী সংগঠন এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে তিনি একবার ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও পরবর্তীতে রোগটি পুনরায় ফিরে আসে, যার ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলার বাইহার শহরে জন্ম নেওয়া মুস্তাক খানের জীবন সংগ্রাম ছিল সিনেমার গল্পের মতোই নাটকীয়। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে যখন তিনি মুম্বাইয়ে আসেন, তখন তাঁর কোনো শক্তিশালী যোগাযোগ বা পরিচয় ছিল না। এমনকি বাড়িতে টেলিফোন পর্যন্ত ছিল না। সেই সময়ে কোনো পরিচালক বা প্রযোজক ফোন করলে তা জানার জন্য তিনি পাশের এক মুদিদোকানদারের সাহায্য নিতেন এবং প্রতিবার খবরের বিনিময়ে তাকে এক টাকা করে দিতেন। এভাবে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করার পর পরিচালক মহেশ ভাটের একটি ফোন তাঁর জীবন বদলে দেয়। চিত্রনাট্যকার সেলিম খানের সুপারিশে মহেশ ভাটের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয় এবং ১৯৮৮ সালে ‘কবজা’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে পদার্পণ করেন।

তিন দশকেরও বেশি অভিনয় জীবনে মুস্তাক খান কখনো প্রধান নায়ক হননি, তবে পার্শ্ব চরিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয় তাঁকে দর্শকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। মহেশ ভাটের আস্থাভাজন হয়ে তিনি ‘আশিকি’, ‘সড়ক’, ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’ এবং ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’র মতো অসংখ্য হিট ছবিতে কাজ করেন। বিশেষ করে ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’তে ভগবতী প্রসাদ মিশ্র চরিত্রটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এছাড়া ২০০১ সালের ব্লকবাস্টার ছবি ‘গদার’-এ সানি দেওলের সাথে গুল খান (গুল্লু) চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল স্মরণীয়, যে চরিত্রে তিনি দুই দশক পর ‘গদার ২’-তেও ফিরে আসেন। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার বাল্লু চরিত্রটি। প্রতিবন্ধী প্রাক্তন হকি খেলোয়াড়ের এই চরিত্রে তাঁর স্বতন্ত্র শারীরিক ভাষা ও কমেডি দর্শকদের মনে গেঁথে যায়। যদিও মুস্তাক নিজেই জানিয়েছিলেন যে, ওই জনপ্রিয় চরিত্রের জন্য তিনি মাত্র ১ লাখ রুপি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন, যা ছিল অত্যন্ত সামান্য।

অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ দেখিয়ে তাঁকে উত্তর প্রদেশে অপহরণ করা হয়। দিল্লি থেকে বিজনোরে নিয়ে যাওয়া মুস্তাককে একটি বাড়িতে আটকে রেখে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার রুপি মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়। পরে সুযোগ বুঝে তিনি পালিয়ে স্থানীয় একটি মসজিদে আশ্রয় নেন এবং উদ্ধার পান। পুলিশি তদন্তে জানা যায়, একই চক্র অন্য অনেক অভিনেতাকেও টার্গেট করেছিল, যার মধ্যে শক্তি কাপুরও ছিলেন।

পর্দার আড়ালে মুস্তাক খান স্ত্রী সালমা খান এবং দুই ছেলে মোহাম্মদ আরশাদ ও মোহসিন খানের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করেছেন। যদিও তিনি কোনো বড় পুরস্কার বা প্রধান চরিত্রের মুকুট পাননি, তবে ছোট ছোট চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের মনে যে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। ‘বালা’ এবং ‘স্ত্রী ২’-এর মতো সাম্প্রতিক সিনেমা এবং বিভিন্ন টেলিভিশন ধারাবাহিকেও তাঁর উপস্থিতি ছিল। একজন পরিশ্রমী শিল্পী হিসেবে মুস্তাক খানের প্রয়াণে বলিউডের এক পরিচিত মুখ হারিয়ে গেল।