যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের টোপেকায় ২০০২ সালে এক রাতে খুন হন কারেন হার্কনেস ও তাঁর প্রেমিক মাইক সিসকো। ঘটনার পর থেকেই সন্দেহের তির ছিল সিসকোর সাবেক স্ত্রী ডানা চ্যান্ডলারের দিকে। গ্রেপ্তার, তিন দফা বিচার, সাজা—সবই হয়েছে, কিন্তু দুই দশক ধরে খুনের রহস্যের নিখুঁত সমাধান এখনো অধরা। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইলিন ও কিন উমবের নামের এক দম্পতি নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের সেই অনুসন্ধান, জেদ এবং সন্দেহের গল্পই এখন উঠে এসেছে এইচবিওর তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘আ কিলার স্টোরি’তে।
২০১৭ সালে কানসাসের আলমা শহর থেকে সাংবাদিক জো সেক্সটনের কাছে একটি ই-মেইল আসে। পাঠিয়েছিলেন গৃহিণী ইলিন উমবের। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ২০০২ সালের সেই জোড়া খুনের সত্যতা জানতে চান কি না সেক্সটন। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও প্রোপাবলিকায় কাজ করা সেক্সটনের কাছে মামলাটি তখন প্রায় সমাধান হয়ে যাওয়া ঘটনা। ২০০২ সালের ৭ জুলাই গভীর রাতে হার্কনেস ও সিসকোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, সিসকোর সাবেক স্ত্রী চ্যান্ডলারই এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। তাঁকে গ্রেপ্তার করে ২০১২ সালে প্রথম ডিগ্রির খুনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাই সেক্সটন ইলিনের প্রস্তাবে সাড়া দেননি। কিন্তু ইলিন থামেননি—কখনো এক সপ্তাহে ১০টি, কখনো এক দিনে ২৫টি ই-মেইল পাঠিয়েছেন তিনি, প্রতিটিতে আদালতের নথি, ব্যালিস্টিকস রিপোর্ট, সম্পত্তির কাগজপত্রসহ নানা তথ্য। একসময় সেই ই-মেইলের সংখ্যা পৌঁছায় ২ হাজার ৭১৪-তে।
ইলিনের এই অনুসন্ধান নিছক শখ ছিল না। তাঁর স্বামী কিন উমবের পেশায় আইনজীবী। নিজেদের অর্থ খরচ করে বহু বছর ধরে তাঁরা চ্যান্ডলারের মামলা খতিয়ে দেখছিলেন এবং তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০১৮ সালে কানসাস সুপ্রিম কোর্ট চ্যান্ডলারের দুই সাজা বাতিল করে নতুন বিচারের পথ খুলে দেয়। তখনই সেক্সটন আগ্রহী হন। সেই সাক্ষাৎ থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়, যার গল্প এখন এইচবিওর তথ্যচিত্রে।
তথ্যচিত্রটির পরিচালক ম্যাথিউ গ্যালকিন। নির্বাহী প্রযোজকদের মধ্যে আছেন অস্কারজয়ী ড্যান কোঘান, জোশুয়া লেভিন এবং স্টোরি সিন্ডিকেটের লিজ গারবাস ও জন বার্ডিন। মামলার শেষ ছয় বছরের ঘটনাপ্রবাহ ক্যামেরায় ধারণ করেছেন নির্মাতারা। তবে তাঁদের লক্ষ্য শুধু খুনি কে, সেই উত্তর খোঁজা নয়; বরং দেখানো হয়েছে, সত্য সম্পর্কে মানুষের নিশ্চিত হওয়ার প্রবণতা কখনো কখনো সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার বদলে উল্টো দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
মামলার প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালের ৭ জুলাই রাতে হার্কনেস ও সিসকো একটি ক্যাসিনোতে গিয়েছিলেন। রাত দেড়টা পর্যন্ত ক্যামেরায় তাঁদের দেখা যায়। পরে হার্কনেসের টাউনহাউসে ফিরে যান তাঁরা। পরদিন হার্কনেসের বাবা তাঁদের মরদেহ খুঁজে পান। দুজনকেই একাধিকবার গুলি করা হয়েছিল। ঘরে টাকা, সিসকোর মানিব্যাগে টাকা, হার্কনেসের গয়না—সব অক্ষত ছিল। গুলির খোসায় আঙুলের ছাপ নেই, প্রত্যক্ষদর্শী নেই, অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। তবে গুলির খোসায় ছিল ইসরায়েলি তৈরি সাবসনিক বুলেট, যা সাধারণত উজি ধরনের অস্ত্রে ব্যবহৃত হয়। কানসাস ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কর্মকর্তা রে লানডিন ঘটনাটিকে ‘ওভারকিল’ হিসেবে দেখেছিলেন।
সিসকোর পরিবার শুরু থেকেই সন্দেহ করত চ্যান্ডলারকে। তাঁদের ১৫ বছরের দাম্পত্যের বিচ্ছেদ ছিল তিক্ত। সিসকো বাড়ি ও সন্তানদের হেফাজত পেয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পর গোয়েন্দা রিচার্ড ভোল চ্যান্ডলারের সঙ্গে কথা বলেন। চ্যান্ডলার ৬ জুলাইয়ের বিভিন্ন কাজের কথা বলেন, যার মধ্যে অটোজোনে যাওয়ার কথাও ছিল। কিন্তু তদন্তকারীরা এমন রসিদ পান, যাতে দেখা যায় তিনি দুটি পাঁচ গ্যালনের গ্যাস ক্যান কিনেছিলেন। তদন্তকারীদের ধারণা হয়, এই জ্বালানি নিয়ে ডেনভার থেকে টোপেকা গিয়ে আবার ফিরে আসা সম্ভব। প্রায় এক দশক সেটি ছিল কেবল তত্ত্ব। ২০১১ সালে ওকলাহোমা থেকে চ্যান্ডলারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১২ সালের মার্চে টোপেকার জুরি মাত্র ৮৩ মিনিটের আলোচনার পর তাঁকে দুটি প্রথম ডিগ্রির খুনে দোষী সাব্যস্ত করে; দেওয়া হয় পরপর দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
কিন্তু মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তখনো সামনে আসেনি। বিচারের সময় প্রসিকিউটর জ্যাকুই স্প্র্যাডলিং দাবি করেছিলেন, সিসকো চ্যান্ডলারের বিরুদ্ধে ‘প্রটেকশন ফ্রম অ্যাবিউজ’ আদেশ নিয়েছিলেন। গোয়েন্দা ভোলও আদালতে সেই আদেশের কথা বলেন। কিন্তু কিন উমবের নথি খুঁজে দেখেন, এমন কোনো আদেশই ছিল না। চ্যান্ডলার আপিল করেন। ২০১৮ সালের এপ্রিলে কানসাস সুপ্রিম কোর্ট তাঁর দুই সাজা বাতিল করে দেন, তবে নতুন বিচারের জন্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ যথেষ্ট বলে জানায়। পরে প্রসিকিউটর স্প্র্যাডলিংয়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অভিযোগ করেন কিন; ২০২২ সালে তাঁকে আইন পেশা থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ইলিন ও কিন কেন এই মামলায় নিজেদের জীবন ঢেলে দিলেন? তাঁরা হাইস্কুলের প্রেমিক–প্রেমিকা ছিলেন। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কিন আবর্জনা সংগ্রহের কাজ করতেন এবং স্থানীয় পত্রিকায় অনুসন্ধানী কলাম লিখতেন। তাঁর লেখা নিয়ে ওয়াবাউনসি কাউন্টির কমিশনারদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়; চাকরি হারানোর পর তিনি মামলা করেন। ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, স্বাধীন ঠিকাদারদেরও সরকারি প্রতিশোধ থেকে মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত। পরে কিন আইন পড়েন। ইলিন ছিলেন সত্যিকারের অপরাধ কাহিনির ভক্ত, তবে চ্যান্ডলারের মামলায় তাঁর আগ্রহের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাস—ধর্মীয় শিক্ষাই তাঁকে এমন মানুষের পক্ষে কথা বলতে অনুপ্রাণিত করেছে, যারা নিজের হয়ে কথা বলতে পারে না।
২০১২ সালে চ্যান্ডলার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ইলিন তাঁকে চিঠি লিখতে থাকেন; শেষ পর্যন্ত চ্যান্ডলার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে রাজি হন। কিন হয়ে ওঠেন মামলাটির আইনজীবী। একপর্যায়ে নিজের আইন পেশাও বন্ধ করে দেন কিন; মামলার জন্য তাঁরা পরিবারের ৫০০ একর জমি বিক্রি করে দেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, চ্যান্ডলার নির্দোষ, তবে হত্যাকারী অন্য কেউ। তাঁদের সন্দেহ গিয়ে পড়ে কারেন হার্কনেসের জামাই জেফ সাটনের ওপর। সাবেক এই কাউন্টি অ্যাটর্নিকে ঘিরে তাঁরা ২০০ পৃষ্ঠার নথি তৈরি করেন, যেখানে তাঁর সহিংসতার ইতিহাস, টাউনহাউসে প্রবেশের সুযোগ এবং উচ্চক্ষমতার অস্ত্রের লাইসেন্সের মতো বিষয় তুলে ধরা হয়। তাঁদের ধারণা ছিল, শেরিফের জব্দ করা অস্ত্রের তালিকা থেকে একটি উজি হারিয়ে গিয়েছিল। একজন ডেপুটিও তাঁদের বলেছিলেন, তিনি সাটনকে ওই ধরনের অস্ত্র হাতে দেখেছেন। কিন্তু কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা তাঁদের সন্দেহকে গুরুত্ব দেয়নি।
গুলির খোসায় পাওয়া একটি চুল পরীক্ষা করা হয়েছিল; ফলাফল—চুলটি কারেন, মাইক বা চ্যান্ডলারের কারও নয়। কিনের তত্ত্ব ছিল, গুলি বের হওয়ার সময় খোসাটি ডান দিকে ছিটকে যায়; একজন বাঁহাতি শুটারের হাতের ওপর দিয়ে সেই গরম খোসা গেলে তাতে চুল পুড়ে লেগে থাকতে পারে। ইলিন পুরোনো একটি সংবাদপত্রের ছবি খুঁজে পান, যেখানে সাটনকে শপথ নেওয়ার সময় বাঁ হাতে স্বাক্ষর করতে দেখা যায়। তাঁরা আদালতের মাধ্যমে সাটনের ডিএনএ নমুনা নেওয়ার উদ্যোগ নেন। বহু বছর পর সাটন তথ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন; তিনি হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরীক্ষার ফল অবশ্য তাঁদের তত্ত্বের পক্ষে যায়নি—চুলটি সাটনেরও নয়।
দ্বিতীয় বিচার শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে। প্রসিকিউটর চার্লস কিট স্বীকার করেন, মামলাটি ডিএনএ, চুল বা আঙুলের ছাপের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; তাঁর যুক্তি ছিল, এটি ঈর্ষা, ক্রোধ ও আসক্তির গল্প। চ্যান্ডলারের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে—হত্যার সময় তিনি কোথায় ছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন কথা বলেছিলেন। বিচারের ১১তম দিনে প্রতিবেশী টেরি অ্যান্ডারসন দাবি করেন, তিনি গুলির শব্দ শুনেছিলেন এবং চ্যান্ডলারের মতো একটি মুখ দেখেছিলেন; কিন্তু আদালতে কোনো ৯১১ কলের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। ছয় দিন আলোচনার পর জুরি বিভক্ত হয়ে যায়—সাতজন দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে, পাঁচজন বিপক্ষে; ফলে মিসট্রায়াল হয়।
তৃতীয় বিচার শুরু হয় ২০২৫ সালে। এবার চ্যান্ডলার নিজের আইনজীবীদের সরিয়ে নিজেই নিজের মামলা লড়েন। তিনি কয়েক দিন ধরে নিজের জীবনের গল্প বলেন, এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আসা নিজের সন্তানদেরও জেরা করেন। প্রসিকিউশন তাঁর ভিন্ন ভিন্ন আলিবি তুলে ধরে। সমাপনী বক্তব্যে প্রসিকিউটর ‘নিয়ন্ত্রণ’–এর ওপর জোর দেন; চ্যান্ডলার পাল্টা বলেন, হত্যার সময় তিনি টোপেকায় ছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু জুরি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে; এবার সাজা—পরপর দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫০ বছর পর্যন্ত প্যারোলের সুযোগ ছাড়া।
‘আ কিলার স্টোরি’ দর্শককে সহজ কোনো উত্তর দেয় না। পরিচালক গ্যালকিন সাত বছর ধরে মামলাটি অনুসরণ করেও বলেন, তিনি এখনো নিশ্চিত নন ডানা চ্যান্ডলার সত্যিই খুনি কি না। শারীরিক প্রমাণ খুবই কম; চ্যান্ডলার যদি সত্যিই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও থাকেন, তাহলে কীভাবে করলেন, সেই প্রশ্নও রয়েছে। সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি ছিল চ্যান্ডলারের নিজের কণ্ঠ—তৃতীয় বিচারে তিনি প্রথমবার নিজের গল্প নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করেন, কিন্তু জুরিকে তা বিশ্বাস করাতে পারেননি। সাংবাদিক সেক্সটনের পর্যবেক্ষণ, নিজের গল্প জানা আর সেই গল্প আদালতে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়। এই তথ্যচিত্র তাই শুধু একটি জোড়া খুনের গল্প নয়; এটি নিশ্চিত হওয়ার মানুষের প্রবণতা, দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, বিচারব্যবস্থা ও সত্যের সীমাবদ্ধতার গল্পও।




