আবাসিক জাহাজ হিসেবে পরিচিত 'ভিলা ভি ওডিসি' (Villa Vie Odyssey) নামের এক বিশাল ক্রুজ শিপের স্বপ্নভঙ্গ হলো। বুধবার কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দর থেকে কেবল ক্রু সদস্যদের নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে জাহাজটি, আর সেখানে আটকা পড়েছেন ২০৩ জন যাত্রী। মূলত জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে এই জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যারা এখন ক্রু এবং জ্বালানির খরচ বহন করছে।
ফ্লোরিডা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ভিলা ভি রেসিডেন্স' জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তাদের মাসিক খরচ বহুল বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে প্রতি কেবিনের জন্য মাসিক জ্বালানি খরচ ছিল ১,৮০০ ডলার, যা বর্তমানে ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ ডলারে পৌঁছেছে। কোম্পানিটি দাবি করেছে, এই বিশাল আর্থিক চাপ যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না, কারণ তারা নির্দিষ্ট মূল্যে দীর্ঘমেয়াদী সমুদ্রযাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এই জাহাজে অধিকাংশ যাত্রীই ছিলেন মার্কিন নাগরিক। জানা গেছে, জাহাজটি এখন সিঙ্গাপুরের দিকে যাচ্ছে এবং সেখানে এটিকে নিলামে তোলা হতে পারে। ৬৪২ ফুট দীর্ঘ এই জাহাজটি মূলত তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল যারা বছরের পর বছর সমুদ্রে বসবাস করতে চেয়েছিলেন। অনেকে এই স্বপ্নের পেছনে তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় এবং বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়েছিলেন। 'এন্ডলেস হরাইজনস' প্রোগ্রামের আওতায় একটি সিঙ্গেল কেবিন নিতে খরচ হয়েছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ ডলার এবং ডাবল কেবিনের জন্য ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ ডলার। এছাড়া বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ফি হিসেবে ২১ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ডলার পর্যন্ত দিতে হতো।
যাত্রীদের জন্য চরম দুঃসংবাদটি আসে গত ২৭ অক্টোবর, যখন তাদের মাত্র আট ঘণ্টার নোটিশে জাহাজ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জাহাজটি তার পরিকল্পিত যাত্রার ৭৫৪ দিন সম্পন্ন করেছিল। অনেক যাত্রী এই ঘটনায় মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন। মাউইয়ের বাসিন্দা ল্যানেট ক্যানেন এবং জোহান বোডিন নামের এক দম্পতি তাদের ইউটিউব চ্যানেলে জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে তারা কোম্পানির আর্থিক সংকটের কথা শুনছিলেন, যা তাদের জন্য ছিল মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক। তবে তাদের চেয়েও করুণ অবস্থা তাদের সেইসব সহযাত্রীদের, যারা অবসরকালীন সব অর্থ এই জাহাজে বিনিয়োগ করেছিলেন এবং এখন তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী চেয়ারম্যান মিকায়েল পিটারসন এই বিপর্যয়ের জন্য নিজেকে দায়ী করলেও মূল কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, যুদ্ধ না হলে ব্যবসাটি সফল হতো। তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে বেড়ে এক পর্যায়ে ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল। মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি জানান, এই যুদ্ধের ফলে গড় আমেরিকান পরিবার প্রতি প্রায় ২,০০০ ডলার অতিরিক্ত খরচ করেছে, যার একটি বড় অংশ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে এসেছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের পুনর্গঠন এবং নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য ৬০ দিন সময় নিয়েছে। তবে কোনো নিশ্চয়তা নেই যে তারা পারবে কি না। পিটারসন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সামাল না আসলে তাদের সম্ভবত 'চ্যাপ্টার ১১' (দেউলিয়া ঘোষণা) প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।




