ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে প্রতিশ্রুতিশীল সিরামিকশিল্পী মো. আনিসুল হকের তৃতীয় একক প্রদর্শনী ‘দ্য জার্নি অব ম্যাটেরিয়াল, ফর্ম অ্যান্ড ফায়ার: ফ্রম ক্লে টু সিরামিক’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি আগামী ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা এই শিল্পকর্মে প্রবেশ করতে পারবেন।
আনিসুল হকের এই প্রদর্শনীর প্রধান আকর্ষণ হলো তাঁর নিরীক্ষাধর্মী কাজগুলো। সিরামিকের গতানুগতিক মসৃণ রূপের বাইরে তিনি এখানে টেক্সচার বা বুনটের এক নতুন ভাষা ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে কাদামাটির সঙ্গে জীর্ণ কাপড়ের সমন্বয়ে তিনি যে রুক্ষ পৃষ্ঠতল তৈরি করেছেন, তা দর্শককে বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বর্ণবাদ এবং তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের হাহাকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর ‘আবরণের অন্তরালে’ এবং ‘জমে থাকা প্রত্যাশা’র মতো কাজগুলোতে ভাঁজ করা কাপড়ের মতো মাটির গঠন ব্যবহার করে শোষিত মানুষের আর্তনাদ ও বৈষম্যের প্রতীক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া নীলচে-সবুজ সারফেসের ওপর রুক্ষ বাঁধনের মাধ্যমে তিনি মুক্তি ও আবদ্ধতার দার্শনিক দ্বন্দ্বকে উপস্থাপন করেছেন।
শিল্পীর ফিগারেটিভ বা অবয়বধর্মী ভাস্কর্যগুলোতে মানুষের শারীরিক গঠনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ বেশি। একটি দণ্ডায়মান নারীমূর্তির ভাস্কর্যের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শৃঙ্খলিত নারীদের অসহায়ত্ব ও নীরব প্রতিরোধের কথা বলেছেন। শিল্পী তাঁর এই সৃষ্টিগুলোকে একটি ‘ভার্সেটাইল মিরর’ বা বহুমুখী আয়নার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার মাধ্যমে সমসাময়িক সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
ধারণাগত ভাস্কর্যের পাশাপাশি প্রদর্শনীতে সিরামিকের ব্যবহারিক বা ইউটিলিটি দিকটিও গুরুত্ব পেয়েছে। আভিজাত্য ও শিল্পের মেলবন্ধনে তিনি তৈরি করেছেন আধুনিক ডিজাইনের জুস সেট, টি-পট ও কাপ। মেটালিক গ্লেজ করা কিছু পাত্র প্রাচীন ব্রোঞ্জ বা তামার রাজকীয় আভা ধারণ করেছে, আবার সবুজ পাত্রে ব্যবহৃত মাছের মোটিফ লোকশিল্পের আধুনিক রূপকে ফুটিয়ে তুলেছে।
শিল্পী মো. আনিসুল হকের মতে, শিল্প সৃষ্টি কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বরং সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলা এবং অর্থবহ বার্তা প্রদান করা। তাঁর মানবতাবাদী দর্শনে ধর্ম বা দেশাতীতভাবে মানুষের পরিচয়ই মুখ্য। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্পীরাই পারেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবজাতিকে জাগ্রত করতে। সিরামিক মাধ্যমটিকে তিনি সত্য প্রকাশ এবং মনকে প্রশান্ত করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সামগ্রিকভাবে, এই প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পকে প্রথাগত ব্যবহারের গণ্ডি থেকে বের করে এক বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।




