২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সামান্তা শারমিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ত্যাগ করেছেন। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে চারটি মূল কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

সামান্তার অভিযোগ অনুযায়ী, এনসিপি তার নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ বা 'লাইন' হারিয়ে ফেলছে এবং কার্যত জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবাধীন হয়ে পড়ছে। তিনি মনে করেন, একটি বড় দলের 'লেজুড়' হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়েছে। এছাড়া, দলের অভ্যন্তরে নারীদের প্রতি রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পড়ছে এবং এনসিপি অতি ডানপন্থী শক্তির সহযোগী হিসেবে ভূমিকা নিচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। চতুর্থ কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, যথাযথ কাউন্সিলিং ছাড়াই দলের কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মূলত প্রায় এক বছর আগে থেকেই এনসিপি নেতৃত্বের সঙ্গে সামান্তার মতাদর্শিক বিরোধ চলছিল। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এই জোটের কারণে আগে আরও ২০ জনের বেশি নেতা দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সামান্তা যদিও তৎক্ষণাৎ দল ছাড়েননি, তবে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম 'রাজনৈতিক পর্ষদ' থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। পরবর্তীতে নেতৃত্ব ফিরে আসার আহ্বান জানালেও জামায়াত জোট বহাল থাকায় তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। গত ২৩ অক্টোবর কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের সময় তাঁকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে নামিয়ে আনা হয়, যাকে এক প্রকার 'পদাবনতি' হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সামান্তার এই পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় এনসিপি নেতৃত্বের কণ্ঠে তেমন বিস্ময় দেখা যায়নি। রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার জানান, সামান্তা দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাই তাঁর এই পদত্যাগ কেবল সেই নিষ্ক্রিয়তারই একটি আনুষ্ঠানিক রূপ। তাঁর মতে, সামান্তা চাইলে জামায়াতবিরোধী ব্লকের নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তবে দলের অন্য নেত্রীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পাদক মনজিলা ঝুমা নাম উল্লেখ না করে ইঙ্গিত করেছেন যে, অনেকে দলটিকে কেবল মই হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন এবং পরে দলের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছেন।

অন্যদিকে, সামান্তার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও 'অলটারনেটিভস'-এর সংগঠক মাহফুজ আলম সামান্তাকে নিয়ে অপপ্রচারের সমালোচনা করে দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার আহ্বান জানান। এছাড়া, আগে দল ছেড়ে যাওয়া চিকিৎসক তাসনিম জারা এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম সামান্তার অভিযোগগুলোকে সত্য বলে অভিহিত করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাকিবুল ইসলামের মতে, এনসিপি বর্তমানে জামায়াতের 'বি টিম' হিসেবে কাজ করছে।