বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা এখন নানা সংকটের মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, এমনকি ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। শিল্পোন্নত দেশ জাপানও এর ব্যতিক্রম নয়, বরং তাদের নিজস্ব কিছু জটিলতাও রয়েছে। দ্বীপরাষ্ট্রটি খাদ্য আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল; ২০২৫ অর্থবছরে ক্যালরির ভিত্তিতে দেশটির চাহিদার মাত্র ৩৮ শতাংশ তারা নিজেরা উৎপাদন করতে পেরেছে। এর পাশাপাশি জনসংখ্যা হ্রাস, কৃষিতে প্রবীণ শ্রমিকের প্রাধান্য এবং তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ কৃষিখাতের ওপর চাপ তৈরি করছে। তাই অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে জাপান সরকার। তবে ভাত-মাছের দেশে প্রধান খাদ্যশস্য ধানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন; সেখানে উৎপাদন চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ হয়। এই সাফল্য ধরে রাখতে তারা নীতি সহায়তা ও পরিবেশবান্ধব প্রণোদনার পাশাপাশি ইয়ামাগাতার মতো প্রধান উৎপাদন এলাকায় নতুন জাত ও প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা জোরদার করেছে। সম্প্রতি জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তোহাকু অঞ্চলের ইয়ামাগাতা জেলায় সাংবাদিকদের একটি সফরের আয়োজন করে, যেখানে ধান গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সফরের শুরুতে তোহোকু আঞ্চলিক কৃষি প্রশাসন কার্যালয়ে টেকসই ধান চাষের সরকারি উদ্যোগ সম্পর্কে জানানো হয়। উৎপাদন বিভাগের মহাপরিচালক হিরোশি ওগাতা ও কাউন্সেলর মাসারু হানাদা সেখানে সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা ব্যাখ্যা করেন। ২০২১ সালে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয় ‘মিদোরি কৌশল’ নামে একটি নীতি কাঠামো প্রণয়ন করে। এর লক্ষ্য হলো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সব পর্যায়ে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করা এবং পরিবেশগত চাপ কমাতে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা। ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষিখাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন শূন্যে নামানো, রাসায়নিক কীটনাশকের ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবহার অর্ধেকে কমিয়ে আনা, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো এবং জৈব চাষের পরিমাণ মোট জমির ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কৌশল বাস্তবায়নে ২০২২ সালে ‘মিদোরি আইন’ কার্যকর করা হয়, যার মাধ্যমে উৎপাদকরা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর জন্য প্রণোদনা পান। ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৭ হাজারের বেশি উৎপাদক করছাড় ও আর্থিক সহায়তার সুবিধা পেয়েছেন। এছাড়া নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার ও গ্রিনহাউস গ্যাস হ্রাসের স্বীকৃতি হিসেবে ‘জে-ক্রেডিট’ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ভোক্তাদের কাছে উৎপাদকদের পরিবেশগত প্রচেষ্টা তুলে ধরতে খাদ্যপণ্যে পরিবেশগত লেবেলিং চালু হয়েছে; নির্গমন হ্রাসের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে পণ্যে এক থেকে তিনটি তারকা চিহ্ন দেওয়া হয়। ইয়ামাগাতা জেলার জাপান সাগরতীরবর্তী সোনাই সমভূমি দেশটির ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। চোকাই ও গাসসান পর্বতের খনিজসমৃদ্ধ পানি এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এই অঞ্চলের কৃষি প্রাকৃতিক সুবিধা রয়েছে। সুরুওকা শহরে অবস্থিত ইয়ামাগাতা সমন্বিত কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ধান প্রজনন ইনস্টিটিউট ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৩০টির বেশি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে হায়েনুকি, সুইয়াহিমে, ইউকিওয়াকামারু ও ইয়ামাগাতামোচি-১২৮ উল্লেখযোগ্য। ইনস্টিটিউটের পরিচালক রেইকো নাকাবা জানান, বর্তমানে স্বাদ অক্ষুণ্ন রাখা, ফলন বৃদ্ধি, উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল জাত উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রজনন পদ্ধতিতে দ্রুত বৈশিষ্ট্য নির্বাচনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবেষকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও বৃহৎ পরিসরে চাষাবাদের প্রবণতা। তাই তারা বিদ্যমান জাতের আগে বা পরে কাটা যায় এমন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন, যাতে কৃষকরা কাজের চাপ ভাগ করে নিতে পারেন। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী পশুখাদ্যের জন্য উচ্চ প্রোটিনযুক্ত ধান, সাকে তৈরির উপযোগী ধান ও আঠালো ভাতের জাত নিয়েও কাজ চলছে। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি নতুন জাত বাজারে আনা হয়। চাষাবাদের পদ্ধতি নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি; পানিতে নিমজ্জিত ধানখেতে প্রলেপযুক্ত বীজ বপন, সরাসরি বীজ বপন ও জৈব সার ব্যবহারের পদ্ধতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। ধানখেত থেকে মিথেন গ্যাস নির্গমন কমানোর জন্য ‘অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ডাইং’ (এডব্লিউডি) পদ্ধতি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে, যা ফলন অক্ষুণ্ন রেখে মিথেন উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এই পদ্ধতি এখন ফিলিপাইনের মতো দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাংলাদেশেও প্রয়োগে আগ্রহী জাপান। ধানের প্রজননে এখন ডিএনএ মার্কার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জিনগত তথ্য নির্বাচনকে আরও নির্ভুল করছে। গবেষকেরা আবদ্ধ কক্ষে কৃত্রিম উপায়ে দুটি প্রজাতির সংযোগ ঘটিয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জাত তৈরি করছেন। ২০২৩ সালে ইয়ামাগাতায় ধানের দানা পুষ্ট হওয়ার সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যার ফলে প্রথম শ্রেণির ধানের উৎপাদন রেকর্ড মাত্রায় কমে যায়। এর পর থেকে উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীলতা গবেষণার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ‘ইউকিমানতেন’ নামের একটি উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল জাতের পরীক্ষামূলক চাষ চলছে, যা ২০২৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প বা সহযোগিতা আপাতত নেই বলে জানান রেইকো নাকাবা; ভাষাগত বাধাই এর প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে তিনি মনে করেন, স্থানীয় আবহাওয়া ও চাহিদা অনুযায়ী গবেষণার লক্ষ্য ভিন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন দেশের গবেষণা সম্পর্কে অবগত। ইয়ামাগাতার এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি অঞ্চলের ধান গবেষণার গল্প নয়; বরং বৈশ্বিক সংকটের মুখে কৃষিকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি, যা বাংলাদেশের মতো ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক বার্তা বহন করে।